অনকোলজি শিশুদের ক্যান্সার

শৈশবে সবচেয়ে বেশি সৃষ্ট ক্যান্সারসমূহ

প্রাপ্তবয়স্করা যে ধরণের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তা থেকে শিশুরা যেসব ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সৃষ্ট ক্যান্সারগুলো শ্বেত রক্ত কণিকা (রক্তের যে কণিকা বা কোষ শরীরকে রোগ থেকে রক্ষা করে), স্নায়ুতন্ত্র, মস্তিষ্ক, হাড়, পেশী অথবা কিডনীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে।

অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকোমিয়া বা এএলএল (Acute Lymphoblastic Leukemia or ALL)

যা আক্রান্ত করেঃ রক্ত ও অস্থি মজ্জা (বোন ম্যারো )

যা হয়ঃ আক্রান্ত অস্থি মজ্জা প্রচুর পরিমাণ শ্বেত রক্ত কণিকা উৎপাদন করে যা অপরিপক্ক অবস্থায় রক্তে চলে আসে। এই অপরিপক্ক রক্ত কণিকাগুলো তাদের যা কাজ অর্থাৎ সংক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করা, তা করতে পারে না।

 এক্ষেত্রে যেসব লক্ষণগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা উচিতঃ

  • হাড় ও হাড়ের জোড়ায় ব্যথা
  • অস্বাভাবিকভাবে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া
  • ওজন কমে যাওয়া
  • অল্পতেই রক্তপাত অথবা শরীরে কালশিরা দেখা দেয়া
  • অজ্ঞাত কারনে জ্বর

গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানঃ শৈশবে সৃষ্ট ক্যান্সারের ৩১% এ জাতীয় ক্যান্সার হয়ে থাকে

ঝুঁকিপূর্ণ বয়সঃ ২ ও ৪ বছর বয়স

মস্তিষ্ক ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের (Central Nervous System) টিউমার

যা আক্রান্ত করেঃ মস্তিষ্ক ও মস্তিষ্কের নিচে স্নায়ুরজ্জু পর্যন্ত অংশ ( মেডুলা অবলাংগাটা, পন্‌স ও মধ্য মস্তিষ্ক)

যা হয়ঃ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ জাতীয় টিউমারগুলো কঠিন ও শক্ত হয়ে থাকে যা প্রাণঘাতী হতে পারে। এরা বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে এবং এর ধরন যে ধরণের কোষ থেকে টিউমারটি সৃষ্ট হয়েছে তার উপর নির্ভর করে। মস্তিষ্ক কোষ থেকে বিভিন্ন ধরণের টিউমার সৃষ্টি হতে পারে।

এক্ষেত্রে যেসব লক্ষণগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা উচিতঃ

  • মাথা ব্যথা
  • বমি বমি ভাব অথবা বমি হওয়া
  • ঝাপসা, অস্পষ্ট অথবা দুইটি করে বস্তু দেখা
  • মাথা ঘোরা
  • হাঁটতে অথবা কিছু করতে সমস্যা অনুভব করা

গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানঃ শৈশবে সৃষ্ট ক্যান্সারের ২১% এ জাতীয় ক্যান্সার হয়ে থাকে

ঝুঁকিপূর্ণ বয়সঃ কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। বিভিন্ন বয়সে ভিন্ন ভিন্ন প্রকরণ আক্রমণ করে

নিউরোব্লাস্টোমা (Neuroblastoma)

যা আক্রান্ত করেঃ সিম্পেথেটিক স্নায়ুতন্ত্র (syspathetic nervous system), যা মস্তিষ্ক ও সারা শরীরের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে। কিডনিতে উপস্থিত অ্যাড্রেনালস নামক বিশেষ নিঃসারক গ্রন্থিকেও এটি আক্রান্ত করতে করে।

যা হয়ঃ ক্যান্সারযুক্ত টিউমারে অপরিপক্ষ স্নায়ু কোষ জন্ম নেয়। এই টিউমার অ্যাড্রেনালসে প্রথমে জন্ম নেয় এবং ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। শিশু জন্ম নেয়ার পূর্বেই এটি ছড়িয়ে যেতে পারে এবং এই জাতীয় টিমার ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সৃষ্ট টিউমার।

যেসব লক্ষণগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা উচিতঃ

  • পক্ষাঘাত
  • শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা হওয়া
  • ডায়রিয়া
  • উচ্চ রক্তচাপ

চোখে দৃশ্যমান পরিবর্তন হওয়া, যেমন চোখের পাতা ঝুলে পড়া, চোখ ফুলে যাওয়া অথবা চোখের নিচে কালি পড়া

গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানঃ শৈশবে সৃষ্ট ক্যান্সারের ৭% এ জাতীয় ক্যান্সার হয়ে থাকে।

ঝুঁকিপূর্ণ বয়সঃ সাধারণত ২ বছর বয়সে ধরা পড়ে। ১০ বছরের অধিক বয়সে এ রোগে আক্রান্ত হওয়া বিরল।

উইলম’স টিউমার

যা আক্রান্ত করেঃ কিডনি

যা হয়ঃ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া যা সাধারণত একটি কিডনিকে আক্রান্ত করে। পেট ফোলা থেকে সাধারণত এই রোগ নির্ণয় করা হয়ে থাকে। এগুলো ২ ধরণের হয়ে থাকে, যার মধ্যে ৯৫% ভালো ধরণের হয়ে থাকে অর্থাৎ চিকিৎসা গ্রহণে ভাল হয়ে যায়।

যেসব লক্ষণগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা উচিতঃ

  • পেট অথবা পিঠ ফুলে যাওয়া অথবা দলা বা পিন্ড দেখা যাওয়া
  • জ্বর
  • ব্যথা
  • বমি বমি ভাব
  • ক্ষুধামন্দা

গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানঃ শৈশবে সৃষ্ট ক্যান্সারের ৫% এ জাতীয় ক্যান্সার হয়ে থাকে। কিডনির ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৯৫% শিশুই উইলম’স টিউমারে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

ঝুঁকিপূর্ণ বয়সঃ ৩-৪ বছর বয়স। ৬ বছরের অধিক বয়সে আক্রান্ত হওয়া বিরল।

লিম্ফোমা

যা আক্রান্ত করেঃ হজকিন লিম্ফোমা’র ক্ষেত্রে এটি লসিকা গ্রন্থি (lymph node) এবং নন-হজকিন লিম্ফোমার ক্ষেত্রে এটি লসিকা তন্ত্রের কোষকে (lymph) আক্রান্ত করে। টনসিল, থাইমাস সহ অন্যান্য লসিকা গ্রন্থি ও সেই সাথে এর সাথে সংযুক্ত অন্যান্য অঙ্গসমূহ, যেমন যকৃত, অস্থি মজ্জা এবং প্লীহাতে আক্রমণ করে। লসিকা তন্ত্রের কোষগুলো হলো বিশেষ প্রতিরক্ষা কোষ যা B ও T লিম্ফোসাইট এবং প্রাকৃতিক ঘাতক কোষ নামে পরিচিত।

যা হয়ঃ এক্ষেত্রে অস্বাভাবিক লিম্ফোসাইট লসিকা তন্ত্রের মাধ্যমে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

যেসব লক্ষণগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা উচিতঃ

  • ওজনহ্রাস
  • জ্বর
  • রাতের বেলা শরীর ঘেমে যাওয়া
  • ক্লান্তিবোধ
  • ঘাড়ের নিচের ত্বক, বগল কিংবা কুঁচকি স্ফীত হওয়া (লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া)
  • হজকিন লিম্ফোমা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানঃ শৈশবে সৃষ্ট ক্যান্সারের ৪% এ জাতীয় ক্যান্সার হয়ে থাকে।

ঝুঁকিপূর্ণ বয়সঃ ১৫ বছর বয়স। ৫ বছরের কম বয়সে আক্রান্ত হওয়া বিরল।

নন-হজকিন লিম্ফোমা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানঃ শৈশবে সৃষ্ট ক্যান্সারের ৬% এ জাতীয় ক্যান্সার হয়ে থাকে।

ঝুঁকিপূর্ণ বয়সঃ ৩ বছরের অধিক বয়স

রেটিনোব্লাস্টোমা

যা আক্রান্ত করেঃ রেটিনোব্লাস্ট, এটি হলো চোখের রেটিনার আদি কোষ, এই রেটিনার মাধ্যেমেই মানুষ চোখে দেখে থাকে।

যা হয়ঃ চোখের যে অংশ দেখায় সাহায্য করে, সে অংশ গঠনকারী অপরিপক্ষ কোষগুলোতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন সৃষ্টি হয়। এই পরিবর্তনের পিছনে জিনগত সংযোগ থাকে। রেটিনোব্লাস্টের ৪০% কেসই অস্বাভাবিক হয়ে থাকে এবং পরবর্তীতে ক্যান্সারযুক্ত টিউমার হওয়ার উচ্চ প্রবণতা থাকে। এক্ষেত্রে উভয় চোখই আক্রান্ত হয়ে থাকে। ৬০% কেসে যখন একটি চোখ আক্রান্ত হয়ে থাকে তবে সেক্ষেত্রে জিনগত সম্পর্ক থাকে না।

যেসব লক্ষণগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা উচিতঃ

  • চোখে যখন আলো ফেলা হয় তখন চোখের মনিতে (pupil) সাদা রঙ দেখা যায়
  • শিশুর চোখ সাধারণত ট্যারা হয়ে যাওয়া
  • চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও ক্রমাগত জ্বালা হওয়া
  • গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানঃ শৈশবে সৃষ্ট ক্যান্সারের ৩% এ জাতীয় ক্যান্সার হয়ে থাকে।

ঝুঁকিপূর্ণ বয়সঃ ২ বছর বয়স

বোন বা হাড়ের ক্যান্সার

গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানঃ শৈশবে সৃষ্ট ক্যান্সারের ৪% হাড়ের ক্যান্সার হয়ে থাকে।

ওস্টিওসারকোমা

যা আক্রান্ত করেঃ হাড়ের দুই প্রান্তে যে অংশে হাড় বড় হয়, যেমন হাত ও পায়ের লম্বা হাড়ের শেষপ্রান্ত।

যা হয়ঃ  হাড় বড় হওয়ার সময়ই হাড়ের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভবনা থাকে। একটি হাড় বড় হওয়ার সময়, হাড়ের ক্রমবর্ধমান অংশের কোষ দ্রুতহারে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, যখন এই বৃদ্ধি অস্বাভাবিক হয় তখন সেখানে ক্যান্সারের জন্ম হয়।

যেসব লক্ষণগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা উচিতঃ

  • হাড়ে ব্যথা যা রাতের বেলা এবং কাজের করার পর বেড়ে যায়
  • হাড়ের পার্শ্ববর্তী অংশ ফুলে যাওয়া
  • ক্লান্তি, জ্বর এবং ওজন হ্রাস

ঝুঁকিপূর্ণ বয়সঃ কিশোর বয়স

ইউয়িং সারকোমা

যা আক্রান্ত করেঃ শ্রোণীচক্রের হাড়, পাঁজর, স্কন্ধফলক (shoulder blades) এবং লম্বা হাড়ের মধ্যম অংশ

যা হয়ঃ এটি এক ধরণের বিরল টিউমার যা হাড়ের মধ্য অংশে, বিশেষ করে ভিতরের ফাকা অংশে আক্রমণ করে।

যেসব লক্ষণগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা উচিতঃ

  • হাড়ে ব্যথা
  • ঘন ঘন হাড় ভেঙ্গে যাওয়া বা ফাটল ধরা
  • ক্লান্তি, জ্বর এবং ওজন হ্রাস

ঝুঁকিপূর্ণ বয়সঃ তরুণ কিশোর বয়স

About the author

Maya Expert Team