নারী স্বাস্থ্য ও দেহতত্ত্ব মাসিক

মাসিকের সমস্যায় কখন ডাক্তার কাছে যাবেন

Written by Maya Expert Team

মাসিক চক্র হলো একজন নারীর মাসিক শুরুর দিন থেকে পরবর্তী মাসিক শুরুর আগের দিন। একজন নারীর মাসিক চক্র ২১ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়, গড়ে ২৮ দিন পর্যন্ত হয়। ঋতুস্রাব বা মাসিক ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত চলে। মাসিকের তারিখ পরিবর্তিত হতে পারে, এটি তেমন কোন জটিল সমস্যা নয়। কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

মাসিক বন্ধ থাকা (Missed Period):

যদি আপনি যৌনমিলন করে থাকেন এবং মাসিক হওয়া বন্ধ হয়, তাহলে আপনার গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে সর্বোত্তম পন্থা হলো প্রেগন্যান্সি টেস্ট করে ফলাফল যাচাই করা। যদি আপনি গর্ভনিরোধক পিল খেয়ে থাকেন তাহলে আপনার মাসিক বন্ধ থাকতে পারে। কিছু গাইনোকোলজিক্যাল সমস্যায় গর্ভনিরোধক পিল দ্বারা চিকিৎসা করা হয় যেমন, পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম (PCOS)। দীর্ঘসময় ধরে গর্ভনিরোধক পিল খেলে অনিয়মিতভাবে মাসিক হতে পারে। হরমোনের অসাম্যের ফলেও মাসিক বন্ধ হতে পারে। এক্ষেত্রে আপনি চাইলে সাহায্য পেতে পারেন।

মাসিক বন্ধ থাকার আরো কিছু কারনঃ

  • মানসিক চাপ
  • হঠাৎ ওজন হ্রাস পাওয়া
  • অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম বা খেলাধুলা
  • খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা যেমন, ক্ষুধামন্দা (anorexia) এবং বুলিমিয়া (bulimia)
  • বুকের দুধ খাওয়ানো

মেনোপজ হওয়ার পূর্বে মহিলাদের অনিয়মিত ডিম্বস্ফোটন (ovulation) এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতার ফলে মাঝে মাঝে মাসিক বন্ধ থাকতে পারে। যদি ৪৫ বছ্র্র বয়সের পূর্বে মাসিক বন্ধ হয় অথবা ৫৫ বছর বয়সের পরেও মাসিক চলতে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অধিক মাত্রায় রক্তক্ষরণ

কিছু কিছু নারীর অধিক পরিমাণে রক্তক্ষরণ হতে পারে এবং রক্তপিন্ড বা চাপ যেতে পারে। নিয়মিত অতিরিক্ত যাওয়ার কারনে অ্যানিমিয়া হতে পারে। মাসিকের সময় অধিকমাত্রায় রক্তক্ষরণ হওয়ার কিছু কারন হলো-

ফাইব্রোয়েড (Fibroid): জরায়ুতে ক্যান্সার নয় এমন টিউমার

  • হরমোনগত পরিবর্তন
  • গর্ভকালীন সময়ে জরায়ুর আকার বৃদ্ধি পাওয়া
  • মাসিকের সময় রক্তপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হওয়া
  • অ্যাডেনোমায়োসিস (adenomyosis): জরায়ুর মাংসপেশির ভিতরে জরায়ু ঝিল্লির বৃদ্ধি পাওয়া
  • এন্ডোমেট্রিওসিস (endometriosis): জরায়ুর ঝিল্লি জরায়ুর বাইরে থাকে।

সাময়িকভাবে বেশি রক্ত নির্গত হলে তেমন চিন্তার কিছু নেই, কিন্তু এটি যদি নিয়মিত চলতে থাকে তাহলে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

ঋতুস্রাবজনিত সংকোচন (Menstrual Cramps):

জরায়ুর উর্বর স্তরটির নির্গত অংশ যোনিপথ দিয়ে বের হওয়ার সময় সংকোচন সৃষ্টি হয়। জরায়ুর মাংসপেশির স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সংকোচনের ফলে এটি হয়ে থাকে। এই সংকোচনের ফলে খুবই কম, মাঝারি ধরনের বা তীব্র ব্যথা হতে পারে। মাসিকের ব্যথাকে ডিসমেনোরিয়া (dysmenorrhoea) বলে। কিছু অস্বাভাবিকতা থাকার ফলে ব্যথা হতে পারে, তবে কোন রোগ ছাড়াও ব্যথা হয়। এধরনের সংকোচনের ফলে অসহ্য ব্যথার ক্ষেত্রে আপনাকে শেখার মাধ্যমে পদক্ষেপ নিতে হবে, নিন্মোক্ত বিষয়গুলো অনুসরণ করুন:

স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণে অভ্যস্থ হোন: প্রচুর পরিমানে টাটকা ফলমূল ও শাকসবজি খান এবং প্রচুর পানি পান করুন। প্রচুর পরিমানে আঁশযুক্ত খাদ্যগ্রহণ, শরীর থেকে অধিকমাত্রার ইস্ট্রোজেন(estrogen) পরিষ্কার করতে সহায়ক (ইস্ট্রোজেনের ফলে অত্যধিক মাত্রার ও ব্যথাযুক্ত মাসিক এবং সংকোচন হয়)। তৈলাক্ত খাবার যেমন, চকোলেট এড়িয়ে চলুন।

সম্পূরক খাদ্য বা পথ্য গ্রহণ করুন: ভিটামিন ই, থায়ামিন, ক্যালসিয়াম, জিংক এবং ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণ করুন।

সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরনে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন: মাসিকের কারনে কোন সমস্যা হলে আপনার চিকিৎসককে সে বিষয়ে বলুন। অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা আছে কিনা সেটি খেয়াল করুন, মাসিকের সময় আপনি কেমন বোধ করেন সেটি লক্ষ্য করুন। ঋতুস্রাবজনিত সংকোচন কিছু রোগ যেমন, এন্ডোমেট্রিওসিস (endometriosis) বা ফাইব্রোয়েড (Fibroid) এর কারনে হতে পারে, এক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে।

ব্যথানাশক ঔষধ: আইবুপ্রোফেন (ibuprofen), ন্যাপ্রোক্সেন (naproxen), অ্যাসিটামিনোফেন (acetaminophen) মাসিকের ব্যথার ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর। যদি সাধারন NSAID জাতীয় ঔষধ কাজ না করে, তাহলে আপনার চিকিৎসক মেফেন্যামিক অ্যাসিড জাতীয় ঔষধ গ্রহণের পরামর্শ দিতে পারেন।

হরমোনাল গর্ভনিরোধক পিল গ্রহণ: গর্ভনিরোধক পিলে হরমোন থাকে যা ডিম্বস্ফোটন(ovulation) প্রতিরোধ করে এবং ঋতুস্রাবজনিত সংকোচনের তীব্রতা হ্রাস করে। এই কারনে আপনার চিকিৎসক ঋতুস্রাবের সংকোচনের চিকিৎসায় গর্ভনিরোধক পিল গ্রহণের পরামর্শ দিতে পারেন। যদি আপনি তরুণী হোন এবং যৌনমিলনে লিপ্ত না হয়ে থাকেন, তাহলে সামাজিক লজ্জা বা পরিবার কি ভাববে (বিশেষ করে মা) এগুলো চিন্তা না করে এই পন্থা অবলম্বন করুন।

বিভিন্ন ভঙ্গিতে শুয়ে দেখুন: কাঁত হয়ে হাঁটু বুকের কাছে নিয়ে শুলে সাময়িকভাবে ব্যথা কমতে পারে। কেউ কেউ বিছানায় বালিশে মুখ গুজে শুয়ে থাকার কথা বলেন। নিম্নাংশ উপরের দিকে উঁচু করে থাকতে পারেন, এতে আপনার গ্যাস বের হবে এবং আপনি আরামবোধ করতে পারেন। বালিশে পা উঁচু করে রেখে চিত হয়ে শোয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

আপনার পেটে গরম পানির ব্যাগ বা হিটিং প্যাড রাখুন: এর ফলে আপনার মাংসপেশিগুলো হালকা হবে। একটি পরিষ্কার গরম কাপড় বা গরম কম্বলও এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। এটিকে ব্যথানাশক ঔষধের মতই কার্যকর হতে দেখা যায়। গরম পানি দিয়ে গোসল করেও দেখতে পারেন।

এমন পোশাক পরুন যা আপনার পেটে চাপসৃষ্টি করবেনা: এমন পোশাক পরুন যা আরামদায়ক, গরম এবং যা থেকে মাসিকের ব্যথা হতে পারে তা দূর করতে সহায়ক।

বিষন্নতা বা মানসিক চাপ দূরীভূত হয় এমন কর্মকান্ডে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করুন যেমন, ইয়োগা, ম্যাসাজ বা মালিশ, মেডিটেশন এগুলো মাসিকের ব্যথা হালকা করতে সহায়ক হতে পারে।

শরীরের নিজস্ব ব্যথানাশককে কাজে লাগান: কিছুটা সময় আপনার মনোযোগ বন্ধুদের সাথে আড্ডা, বই পড়া, কম্পিউটারে গেম খেলা বা ফেসবুকে ব্যয় করুন। হালকা শরীরচর্চা করুন যার ফলে আপনার সেরোটোনিনের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। সেরোটোনিন হলো শরীরের নিজস্ব ব্যথানাশক এবং এর প্রভাবে আমরা সুখ অনুভব করি।

মাসিকচক্রের মাঝে বা সহবাসের পর রক্তক্ষরণ

মাসিকচক্রের মাঝে বা সহবাসের পর রক্তক্ষরণ(post-coital bleeding) হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করাতে হবে। এটি কোন ইনফেকশন, বা সার্ভিক্স(জরায়ুর নিচের অংশ)-এর অস্বাভাবিকতা বা কোন ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। মাসিকচক্রের মাঝে বা সহবাসের পর রক্তক্ষরণ কিছু ক্ষতিকর নয় এমন কারনে হতে পারে যেমন, পলিপ, ইনফেকশন (যেমন- Chlamydia)। স্বল্পমাত্রায় গর্ভনিরোধক পিল খেলেও এই রকম রক্তক্ষরণ হতে পারে।

তবে কারন যাই হোক না কেন, এই ক্ষেত্রে অবশ্যই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের প্রতি ৩ বছরে একবার এবং ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সী নারীদের প্রতি ৫ বছরে একবার জরায়ু মুখের ক্যান্সার (cervical cancer) পরীক্ষা করানো উচিত।

হঠাৎ পরিবর্তন

মাসিকের যেকোন পরিবর্তন- অতিমাত্রায় বা কম মাত্রায় রক্তক্ষরণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, বিশেষ করে আপনার যদি ৪০ এর বেশি বয়স হয় তাহলে অবশ্যই পরামর্শ গ্রহণ করুন। আপনার বয়স ৪০ এর কম হলে মাঝে মাঝে অনিয়মিত রক্তক্ষরণ অস্বাভাবিক নয়।, বিশেষ করে যাদের মাঝে নতুন পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ৪০ এর বেশি বয়স্ক নারীর যদি অধিকমাত্রায় রক্তশক্ষরণ হয় বা মাসিক বেশিদিন স্থায়ী হয়, সেক্ষেত্রে কারন কি তা যাচাই করতে হবে। এটি ক্যান্সারের পূর্বলক্ষণ হতে পারে, যদি তা প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় করা যায় তাহলে চিকিৎসা করা সম্ভব।

মেনোপজের পর রক্তক্ষরণ

যদি কয়েক বছর ধরে আপনার মাসিক না হয় অথচ রক্তক্ষরণ হচ্ছে, সেক্ষেত্রে কি হচ্ছে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করবেন না। অবিলম্বে গাইনি বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন। কারন এটি ক্যান্সারের পুর্ব লক্ষণ হতে পারে।

যোনিপথে স্রাব যাওয়া

যোনিপথে স্রাব যাওয়া স্বাভাবিক এবং মাসিকচক্রের মাঝে এটি পরিবর্তিত হয়। স্বচ্ছ, মসৃণ স্রাব নির্গত হওয়া স্বাভাবিক, বিশেষ করে ডিম্বস্ফোটনের(ovulation) সময়। যখন স্রাব সবুজ ধরনের, রক্তবর্ণ অথবা দূর্গন্ধযুক্ত হবে, অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

এই তথ্যগুলো শুধুমাত্র পরামর্শ প্রদানের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। এটি কোন চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের জন্য দেওয়া হয়নি।

About the author

Maya Expert Team

Leave a Comment