কৈশোর স্বাস্থ্য খাদ্যাভ্যাস সংক্রান্ত সমস্যা স্বাস্থ্য

বুলিমিয়া

Written by Maya Expert Team

বুলিমিয়া নার্ভোসা একটি খাবার গ্রহন জনিত রোগ এবং মানষিক সমস্যা।যাদের বুলিমিয়া আছে তারা মারাত্মক ভাবে নিজদের খাওয়া কমিয়ে, পরে মাত্রাতিরিক্ত খায় এবং পরে নিজে নিজে বমি করে বা লাক্সাটিভ খেয়ে তা শরীর থেকে বের করে দেয়ার মাধ্যমে নিজেদের ওজন নিয়ন্ত্রন করে।

বলিমিয়ার কারণঃ

বুলিমিয়া কেন হয় এই প্রশ্নটির কোন সহজ উত্তর নেই। যদিও এটি মোটা হয়ে যাওয়ার ভয় থেকে তৈরী হয়, অনেক জটিল একধরনের আবেগ জড়িত থাকে। মাত্রারতিরিক্ত খাওয়া এবং পরে তা শরীর থেকে বের করে দেয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া।

১) আবেগ জড়িত কারন গুলোঃ

  • আত্মসম্মানের কমতি
  • হতাশা

শারীরিক ভাবে আসুস্থতা, যৌন নির্যাতনের শিকার, শৈশব যাদের ওনেক কষ্ঠে কেঠেছে, পারিবারিক সমস্যা, ঝগড়া এবং যারা নিন্দা সহ্য করার অভিজ্ঞতা আছে তারাও বুলিমিয়াতে আক্রান্ত হতে পারেন।

বুলিমিয়া প্রায় সময় অন্য মানসিক  সমস্যার সাথে জড়িত থাকে। গবেষণাতে দেখা গেছে বুলিমিয়া তাদের মধ্যে হওয়ার সম্ভবনা বেশি যাদেরঃ

  • উদ্বেগ জনিত রোগ,
  • অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার ,
  • পোষ্ট ট্রমাটিক ষ্ট্রেস ডিজঅর্ডার ,
  • ব্যাক্তিত্ব সংক্রান্ত সমস্যা থাকে

২) সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক চাপঃ

কেউ কেউ মনে করে মিডিয়া আর ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি ওজন কম রাখার জন্য মানুষের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।

৩) বয়:সন্ধি: 

অনেক যুবতী মেয়েরা বয়ঃসন্ধির সময় খাবার জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে, যখন হরমনের কারনে তারা তাদের শরীর সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন থাকে। যদি টিনেজাররা মনে করে তাদের জীবনে আর কোন চাওয়া পাওয়া নেই, তাদের উপর বুলিমিয়া রোগ ভর করে।   

৪) জেনেটিক্স:

বুলেমিয়া হওয়ার জন্য জেনেটিক ফ্যাক্টর দায়ী হতে পারে। গবেষনাতে দেখা গেছে যাদের নিকট আত্নীয়দের বুলিমিয়া আছে অথবা ছিল, তাদের বুলিমিয়া হবার সম্ভবনা যাদের এমন নিকটাত্নীয় নেই তাদের চেয়ে ৪ গুন বেশি।  

৫) পুরুষ এবং বুলিমিয়াঃ

পুরুষদের মধ্যে বুলিমিয়ার কারন সামান্য অন্যরকম। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যারা বডিবিল্ডিং করে অথবা অ্যাথলেট, নাচানাচি অথবা ঘোড়সাওয়ারি করে তাদের মধ্যে তৈরী হয়। যা হোক, অনেক মহিলাদের মত, যুবক পুরুষদের মধ্যে বুলিমিয়া হবার হার বেড়ে চলছে।

বুলিমিয়াকে বলতে কি বুঝি?

খাওয়া সম্পর্কিত রোগ গুলো সাধারনত খাবার আর শরীর দেখতে কেমন লাগে এমন অস্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে জড়িত।

যারা এই রোগে ভুগছেন তারা তাদের খাওয়ার অভ্যাস আর আচারন কে তাদের মানষিক অশান্তির সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন এবং তারা প্রায় সময় খাবারের, ক্যালরির এবং মোটা হয়ে যাওয়ার অস্বাভাবিক আর অবাস্তব একটি ভয়ে থাকে।

এই ভয়ের কারনে, বুলিমিয়া নার্ভোসাতে আক্রান্ত মানুষেরা তাদের খাবার গ্রহণ সীমিত করে দেয়। এর ফল তারা মাত্রাতিরিক্ত খায় এর পর বমি ব লেক্সাটিভের মাধ্যেমে তা শরীর থকে বের করে দেয়। অনেক কম ক্ষেত্রে এই বের করে দেয়া হয় ডায়েট করার পিল খেয়ে, অতিরিক্ত ব্যায়াম, মারাত্মক ডায়েটিং, অনেক সময় না খেয়ে এবং মাঝে মধ্যে বে-আইনী ওষুধ সেবন করার মাধ্যমে যেমনঃ- এম্ফিটামিন। তারা এই খাবার বের করে দেয় কারন তারা মনে করে মাত্রাতিরিক্ত খাবার তাদের ওজন বাড়িয়ে দিবে, এবং সাধারনত খাওয়ার পর তারা অপরাধ বোধ করে আর এই আচারনের/খাওয়ার কারনে তারা লজ্জিত থাকে।এজন্য তারা এসব গোপনে করে থাকে। এই মাতারতিরিক্ত খাওয়া আর বের করা একটি চক্রাকারে চলতে থাকে যা ক্ষুধা আর মানষিক চাপের কারনে বাড়তে পারে, অথবা মানষিক আশান্তির সাথে মানিয়ে নেয়ার একটি পদ্ধতি বলে মনে করা হয়।

অপরাধবোধ চক্র

বুলিমিয়া আসলে একটি দুষ্ট চক্র। যদি আপনার এই সমস্যা থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনার আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি আছে । আপনার উচ্চতা আর গঠন অনুযায়ী আপনার ওজন স্বাভাবিক অথবা এর কাছাকাছি হলে ও আপনি মনে করতে পারেন আপনার ওজন অনেক বেশি।

এটি আপনাকে ডায়েট করার মত কঠোর নিয়ম পালনে উৎসাহিত করে, যা মেনে চলা অনেক কষ্টসাধ্য। যদি আপনি এই কঠোর নিয়ম পালনে ব্যার্থ হোন তাহলে পরে দেখা যায় আপনি সে সকল খাবার মাত্রাতিরিক্ত খাওয়া শুরু করেছেন যা আপনি খেতে অনিহা প্রকাশ করেছিলেন। এরপর মাত্রাতিরিক্ত খাওয়ার কারনে আপনার অপরাধবোধ জাগবে এবং আপনি সকল খাবার শরীর থেকে বের করে (বমি না লাক্সাটিভ এর মাধ্যমে)এই অতিরিক্ত ক্যালরি থেকে মুক্তি পেতে চাইবেন।

বুলিমিয়ার লক্ষনঃ

প্রধান উপসর্গ হল মাত্রাতিরিক্ত খাওয়া আর তা বমির মাধ্যমে বের করে দেয়া। তার মধ্যে কিছু মানষিক সমস্যা ও থাকতে পারেঃ

  • খাবার এবং খাওয়ার এর প্রতি একটি মাত্রাতিরিক্ত টান
  • শরীরের ওজন আর কমানো নিয়ে অবাস্তব  অভিমত
  • বিষন্নতা আর দুশ্চিন্তা
  • একাকিত্বঃ অন্য মানুষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা

যদি চিকিৎসা না করা হয় তাহলে বুলিমিয়ার কারনে অনেক শারীরিক সমস্যা হতে পারে।

বুলিমিয়ার জটিলতা

কিছু শারীরিক সমস্যা আছে যা বুলিমিয়ার সাথে জড়িত-

দাঁতের সমস্যাঃ দাঁতের ক্ষয়, অধিক পরিমানে বমির ফলে মুখ থেকে খারাপ গন্ধ আসতে পারে এবং গলার ইনফেকশন হতে পারে।

অনিয়মিত মাসিকঃ ভবিষ্যতে বাচ্চা নিতে সমস্যা হতে পারে।

চামড়ার এবং চুলের সমস্যা : অতিরিক্ত বমির কারনে আমাদের লালা গ্রন্থি গুলো ফুলে যায় যার ফলে মুখ গোলাকার দেখায়।

পেটের সমস্যাঃ অতিরিক্ত লাক্সাটিভ ব্যাবহারের কারনে আমাদের অন্ত্রের মাংশপেশি নষ্ট হতে পারে, যার কারনে পরবর্তীতে স্থায়ী ভাবে কৌষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।

হার্টের সমস্যাঃ অনেক দিন ধরে বুলিমিয়ার কারনে হার্টের সমস্যা হতে পারে।

বুলিমিয়া রোগ নির্নয়ঃ

যদি আপনার খাবার গ্রহন সংক্রান্ত রোগ যেমন বুলিমিয়া থাকে, তার প্রথম পদক্ষেপ হবে আপনার সমস্যা আছে তা নির্নয় করা এবং একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া। আপনার মনে হবে এটি তেমন কোন বড় সমস্যা নয়, কিন্তু বুলিমিয়া অনেক দীর্ধ মেয়াদি শারীরিক সমস্যা করতে পারে।

 আপনি মেনে নিলেন আপনার সুস্থ হবার জন্য সাহায্য এবং সহযোগিতার দরকার আছে, কিন্তু মনে রাখবেন এটি একটি অনেক কঠিন পদক্ষেপ যা আপনি নিতে যাচ্ছেন। যাদের বুলিমিয়া রোগ আছে তারা কারো সাহায্য নেয়ার আগে, এই রোগটি মাস এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত লুকিয়ে রাখেন।একজন বুলিমিয়াতে আক্রান্ত যাতে কারো সাহায্য চাইতে পারে তার জন্য নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলা, নতুন নতুন মানুষের সাথে মেলেমেশা করা উচিত যাতে করে এই সমস্যার সমাধান করা যায়।

বুলিমিয়া থেকে সম্পুর্ণ আরোগ্য লাভ করা সম্ভব। যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা যাবে তত তাড়াতাড়ি রোগ থেকে সেরে উঠা সম্ভব।

বুলিমিয়ার চিকিৎসা : 

যে সকল চিন্তা ভাবনা কারনে তাদের এই খাবার গ্রহনের সমস্যা এবং খাবার আর ওজন এর প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করছে, যাদের বুলিমিয়া আছে তাদের এসকল সুপ্ত কারন গুলো বের করতে হবে এবং বুঝতে হবে। আপনার ডাক্তার আপনাকে মানষিক চিকিৎসা এর সাথে কিছু ওষুধ ব্যবহার করতে বলতে পারেন।   

যদি এ চিকিৎসা আপনার ক্ষেত্রে তেমন সুফল দিতে না পারে তাহলে একজন ডাক্তারের তত্ববধানে থেকে আপনাকে কগ্নিটিভ বিহেবিয়ার থেরাপী নিতে হবে। কিছু মানুষ আবার এন্টিডিপ্রেসেন্ট ড্রাগ থেকে উপাকার পেয়েছেন, কারন এটি আপনার মাত্রাতিরিক্ত খাওয়ার এবং বমি করার ইচ্ছা কমিয়ে রাখে।

কগ্নিটিভ বিহেবিয়ার থেরাপী হল বুলিমিয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত থেরাপি। এটি মধ্যে আছে একজন থেরাপিষ্টের সাথে কথা বলা এবং আপনার আবেগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার মধ্যে, আপনার অবস্থা, অনুভুতি এবং খাবার এর ব্যাপারে নতুন করে চিন্তা করার পথ বের করা। এটির সাথে হয়তবা আপনাকে একটি ডায়েরী রাখতে হতে পারে যাতে আপনার খাবারের বিস্তারিত থাকবে, এই ডায়েরী কোন কারনে আপনার এই মাত্রাতিরিক্ত খাওয়া হচ্ছে তা বের করতে সাহায্য করবে।

বুলিমিয়ার চিকিৎসা সাধারনত হাসাপতালে করা হয় না। যাই হোক, যদি আপনার মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুকি থাকে এবং এর কারনে আপনার জীবন বিপন্ন হতে পারে, তাহলে আপনি হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন। যদি আপনার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবনতা থাকে অথবা নিজেকে ক্ষতি সাধন করার সম্ভবনা থাকে তাহলে আপনাকে হাসপাতালের চিকিৎসা নিতে হতে পারে।

এ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়: 

একবার রোগ নির্ণয় হওয়ার পর, যাদের বুলিমিয়া আছে তারা সুস্থ হতে পারে, কিন্তু এর জন্য অনেক দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন।। যার বুলিমিয়া আছে তার জন্য এবং তার পরিবার এবং বন্ধু বান্ধবদের জন্য ও অনেক কষ্ঠসাধ্য হতে পারে।

সুস্থ হতে, বুলিমিয়া আক্রান্ত রোগীর কিছু করণীয়ঃ

  • খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা
  • খাবারের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো
  • যদি প্রয়োজন হয় তাহলে সাবধানতার সাথে ওজন বাড়ানো।

বুলিমিয়া যত বেশি দিন থাকবে,পুনরায় স্ব্যাস্থকর খাবার খেতে শেখা এবং সঠিক ভাবে ওজন বৃদ্ধি করা ততই কঠিন হয়ে পড়ে।তাই এর চিকিৎসা যত দ্রুত সম্ভব শুরু করা উচিত যাতে করে সুস্থ হবার সম্ভবনা বেশি থাকে।

ছবি সূত্র : pinterest.com

 

About the author

Maya Expert Team

Leave a Comment