বুকে ব্যাথা হৃদরোগ সংক্রান্ত

বুকে ব্যথা

Written by Maya Expert Team

বুকে ব্যথায় শুধু আপনার বুকেই নয়, আপনার শরীরের উপরের অংশে ছাড়াও ঘাড় থেকে পাঁজর পর্যন্তও ব্যথা হয়।

যদিও বুকে ব্যথা অনেক ধরনের অসুখেরই লক্ষণ হতে পারে, তারপরও এটাকে গুরুত্বের সাথে নেয়া উচিত, কারণ বুকে ব্যথা হার্ট অ্যাটাকেরও লক্ষণ।

এখানে দেওয়া তথ্য ও উপদেশ থেকে আপনি নিজেই নিজের চিকিৎসা করবেন তা কিন্তু না, এখানে দেওয়া তথ্য থেকে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার বুকে ব্যথা কোন পর্যায়ে আছে, আপনার কি এখুনি চিকিৎসকের সাহায্য নেয়া উচিত নাকি আরও কিছুদিন অপেক্ষা করার মত পর্যায়ে আপনি আছেন। এখানে বুকে ব্যথা হওয়ার একেবারে খুঁটিনাটি কারণ নিয়ে বলা হয়নি, তবে সবচেয়ে বেশী কি কারণে বুকে ব্যথা হয়, সবচেয়ে জরুরি কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

কখন সাহায্য নিতে হবে:

আপনার বুকে ব্যথা হার্টের ব্যথা কিনা কীভাবে বুঝবেন:

  • শারীরিক পরিশ্রমের কারণে ব্যথাটা শুরু হয়, বিশ্রামে ব্যথা কমে যায়
  • ব্যথাটা খুব বেশী, জোরে হয় এবং মনে হয় চেপে আসছে
  • আপনার বুকে ব্যথার পাশাপাশি অন্য লক্ষণও দেখা দেয়, যেমন- দম ফুরিয়ে যাওয়া, বমি বমি ভাব, অনেক ঘামানো, হঠাৎ করে শির শির করে ব্যথা শুরু হয়ে হাতে ছড়িয়ে পড়া( সাধারণত বাঁ হাতে)
  • আপনার করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকলে, যেসব কারণে এমন হতে পারে- যদি আপনি ধূমপান করেন, আপনার উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপার-টেনশন থাকলে, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরলের মাত্রা শরীরে বেশী থাকলে, স্থূলতা থাকলে অথবা পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে

এটা কি হার্ট অ্যাটাক?

যদি শারীরিক পরিশ্রমের কারণে আপনার বুকে ব্যথা হয় এবং কাজকর্ম বন্ধ করে ফেললে ব্যথা কমে যায়, তবে আপনার অ্যানজাইনা হয়েছে। বুকের ব্যথা বা চাপা ভাবটা বুক থেকে আপনার বাঁ হাত, ঘাড় ও পিঠে ছড়িয়ে পড়বে।

হার্টে রক্তের সীমিত চলাচলের কারণে অ্যানজাইনা হয়। এর কারণ হচ্ছে আপনার হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ করে এমন তিনটি ধমনীই সরু হয়ে গিয়েছে। হার্ট পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না বলে আপনার বুকে ব্যথা হয়। যদি উপরে বর্ণনা করা লক্ষণগুলো আপনার ক্ষেত্রে দেখা দেয়, কিন্তু ব্যথাটা ১৫-২০মিনিটের চাইতে বেশীক্ষণ থাকে, তবে আপনার হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। হার্ট অ্যাটাকের সময় আপনার মনে হবে আপনার বুকে খুব জোরে কিছু চাপ দিচ্ছে, বা ভারী কিছু আপনার বুকের উপর চারপাশ থেকে চাপ দিচ্ছে।

অ্যানজাইনা এবং হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো হলঃ

  • অ্যানজাইনা মৃদু, অল্প সময়ের জন্য হয়, সাধারণত শারীরিক পরিশ্রমের জন্য হয়
  • হার্ট অ্যাটাক হলে ব্যথাটা ওষুধ (গ্লাইসেরিল ট্রাইনাইট্রাইট স্প্রে যেটা ব্যবহারে অ্যানজাইনার ব্যথা দ্রুত উপশম হয়) নেয়ার পরও থেকে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হার্ট অ্যাটাক বিশ্রামকালে অথবা ঘুমের মধ্যে হয়। এটা প্রচণ্ড ঘাম ও বমি বমি ভাব সহ অনেক লক্ষণের সাথেই হয়।

আপনি যদি আপনার বুকে ব্যথাকে হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে ভেবে জরুরী ভিত্তিতে চিকিৎসকের কাছে যান, কিন্তু দেখা গেল আপনার হার্ট অ্যাটাক হয়নি, এতে লজ্জা পাবার কিছু নেই। কারণ আপনার এই ভুল আশঙ্কা থেকে আপনি সাবধান হওয়ার সুযোগ পাবেন। অসুস্থ হওয়ার চাইতে নিরাপদে থাকাটাই কি ভাল নয়?

 

বুকে ব্যথা হওয়ার সাধারণ কারণগুলো  

বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই বুকে ব্যথা হয় হার্ট সংক্রান্ত কারণে। বুকে ব্যথা হওয়ার সাধারণ কারণ গুলো হল:

  • বুকজ্বলা এবং গ্যাসট্রো-অসোফ্যাগাল রিফ্লাক্স ডিজিজ (জিওআরডি)- এই অসুস্থতায় আপনার পাকস্থলী যে এসিড ছাড়ে সেটি আপনার খাদ্যনালীতে চলে যায়
  • অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা
  • পেশীতে টান পড়লে
  • শিনায় ব্যথা

নিচের তথ্যগুলো থেকে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার বুকে ব্যথা আসলে কেন হচ্ছে। যদিও আপনি একটা ধারনা পেয়ে যাবেন আপনার বুকে ব্যথার কারণ সম্পর্কে, তারপরও আপনার উচিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এবং সঠিকভাবে পরীক্ষা করানো, এরপর কি করা উচিত সে বিষয়ক চিকিৎসকের পরামর্শ ঠিকভাবে মেনে চলা।

শুয়ে থাকা অবস্থায় যে বুকে ব্যথা বাড়ে

যদি শুয়ে থাকার ফলে আপনার বুকে ব্যথা বেড়ে যায় তবে এটা আপনার পাকস্থলী থেকে বের হয়ে আসা এসিড যা  আপনার খাদ্যনালীতে চলে এসেছে, তার ফলে হতে পারে। এ সমস্যা কমবেশি অনেকেরই হয়, এবং একে বুকজ্বলা এবং গ্যাসট্রো-অসোফ্যাগাল ডিজিজ বলে। জীবনযাপনের ধরণ বদলে এবং দরকার পড়লে ওষুধের মাধ্যমে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব।

তবে খেয়াল রাখা উচিত যে হার্টের ব্যথা শুয়ে থাকা অবস্থায় হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যানজাইনা ডেকুবিটাস যা হার্ট ফেইলের মত অবস্থা, এতে বুকে চাপ পড়ে এবং সুঁই ফোটানোর মত ব্যথা হয়। তাই শুয়ে থাকা অবস্থায় আপনার যদি এমন ব্যথা হয় জা আপনি বুঝতে পারছেননা, আপনার উচিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।

বুকে ব্যথা এবং বুক নরম হয়ে যাওয়া

বুকে ব্যথা হয়ে বুক নরম হয়ে যাওয়ার অনেক কারণ আছে। যদি বুকে ব্যথা হয়, বুক নরম হয়ে যায় কিন্তু কোন ফোলাফোলা ভাব না থাকে তবে এটি সম্ভবত আপনার বুকের পেশীতে টান পরার কারণে হয়েছে। এতে অনেক ব্যথা হয়, তবে বিশ্রাম নিলে ধীরে ধীরে ব্যথা কমে যায় এবং সময়ের সাথে আপনার পেশী ঠিক হয়ে যায়। যদি আপনার পাঁজরের কাছে ব্যথা, নরম ও ফোলাফোলা ভাব থাকে, তবে আপনার সম্ভবত কস্ট্রোকন্ড্রিটিস বা টিয়েটজা নামক সমস্যা হয়েছে। এটা হওয়ার কারণ হচ্ছে যে তরুণাস্থি দিয়ে পাঁজর আপনার বক্ষাস্থির সাথে যুক্ত সেখানে প্রদাহ হওয়া। কয়েক সপ্তাহ পর ব্যথার ওষুধের নিলে আপনার এই ব্যথা চলে যাবে। দুশ্চিন্তার কারণেও আপনার বুকে ব্যথা হতে পারে। আপনি দুশ্চিন্তা করার সাথে সাথে আপনার শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে যেমন- বুকে ব্যথা, দম ফুরিয়ে যাওয়া, প্যালপিটিশন। আপনার চিকিৎসক দুশ্চিন্তার কারণে হওয়া বুকে ব্যথার চিকিৎসা হিসেবে আপনাকে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা যেমন কাউন্সেলিং নিতে বলতে পারেন।

 

অন্যান্য কারণসমূহ

বুকে ব্যথার অন্যান্য যেসব কারণ আছে তা নিচে আলোচনা করা হল। যদি আপনি সন্দেহ করেন যে আপনার এগুলোর কোন একটি আছে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিনঃ

 প্লুরিসি

প্লুরিসি হচ্ছে ফুসফুসের চারিদিকে যে দুই-স্তরের পর্দা থাকে সেখানে প্রদাহ হওয়া। এই দুটো স্তর পরস্পরের সাথে ঘর্ষণের ফলে তীক্ষ্ণ, ছুরিকাঘাতের মত ব্যথা হয়। নিশ্বাস নেয়ার সাথে বা লম্বা শ্বাস নিলে এই ব্যথাটা হয়। হালকা নিশ্বাস নিয়ে প্লুরিসির ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ব্যথাটা আইবুপ্রফেন দিয়ে কমানো যায়, এর মধ্যে আপনার চিকিৎসক প্লুরিসির কারণ খুঁজে বের করবেন।

শিঙ্গলস

শিঙ্গলস হচ্ছে স্নায়ু এবং তার আশেপাশের এলাকায় সংক্রমণ। এটি হার্পিস ভ্যারিসেলা-যোস্টার ভাইরাসের কারণে হয়, এই ভাইরাসের কারণে চিকেনপক্স হয়। শিঙ্গলস এর র্যা শ সাধারণত শরীরের ডান অথবা বাম পাশে হয়, কিন্তু শরীরের মধ্যবর্তী অংশে হয়না ( মধ্যবর্তী রেখা হচ্ছে শরীরের একটি কাল্পনিক রেখা যেটা আপনার দুই চোখের মাঝখান থেকে আপনার নাভির আগ পর্যন্ত কল্পনা করা একটি রেখা)।

স্তন-প্রদাহ

স্তন-প্রদাহ হচ্ছে সংক্রমণের কারণে স্তনে ব্যথা হওয়া এবং ফুলে যাওয়া, এটা বেশী হয় স্তন্যদানকালীন সময়ে। সংক্রমণ দূর করতে অ্যান্টিবায়োটিক নিতে বলা হয়। আপনাকে এর জন্য আপনার শিশুকে স্তন্যদানের পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হতে পারে। আপনার চিকিৎসক আপনাকে এব্যাপারে আরও পরামর্শ দিবেন। স্তন-প্রদাহ সম্পর্কে আরও পড়ুন।

About the author

Maya Expert Team

Leave a Comment