নারী স্বাস্থ্য- প্রসব এবং পরবর্তী স্বাস্থ্য সংক্রান্ত

বাচ্চার জন্মের পর সেক্স ও গর্ভনিরোধ

সেক্স

ছোট বাচ্চা থাকার কারণে আপনার সেক্স লাইফ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সারা দিনের ক্লান্তি এবং ধকল শেষে নিজেদের ভিতর কিছুটা ঘনিষ্ঠ সময় কাটানোর অনেকেরই সময় হয়ে উঠে না। আপনি ও আপনার সঙ্গী হয়তো নিজেদের এই পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিবেন। কিন্তু যদি আপনার সেক্স লাইফ বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে তাহলে কিছুটা পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। লাইফ এ সেক্স এর ঘাটতির কারণে বিভিন্ন ধরণের সমস্যা দেখা দিতে পারে যা কিনা আপনাদের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

 

বাচ্চা জন্মের পরপর ই বেশির ভাগ মহিলারাই প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে্ন এবং অনেক দুর্বল বোধ করেন। তাদের স্বাস্থ্য নিয়ে তারা চিন্তিত থাকেন এবং আবার প্রেগন্যান্ট হয়ে পরার একটি আশঙ্কা তাদের ভিতর থাকে। অন্য দিকে   এই সময় কিছুটা ক্লান্তি বোধ করা ছাড়া বাচ্চার বাবাদের  সেক্সুয়াল চাহিদা কিন্তু আগের মতই থাকে। তবে তারা তাদের স্ত্রীদের জন্য চিন্তিত থাকেন। এই সময় কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয় সেগুলো নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে থাকেন। আসলে বাচ্চা জন্মের পর আবার কখন সেক্স করা যাবে এর কোন নির্দিষ্ট সময় সীমা নেই। তবে অবশ্যই তাড়াহুড়া করা যাবেনা। বেদনাদায়ক সেক্স মোটেও কাম্য নয়।

এই ক্ষেত্রে নিচের কিছু উপদেশ আপনার কাজে আসতে পারেঃ

লিঙ্গ প্রবেশ  করার সময় ব্যথা পেলে তা অবশ্যই সাথে সাথে আপনার স্বামী কে জানাতে হবে। ব্যাথার কথা প্রকাশ না করে যদি লুকিয়ে রাখেন তাহলে ধীরে ধীরে আপনার কাছে সেক্স একটি অপ্রীতিকর ও বিরক্তিকর ব্যপার হয়ে উঠবে। লিঙ্গ প্রবেশ না করেও একে অপরকে আনন্দ দেয়া সম্ভব। যেমন পারস্পরিক হস্তমৈথুন এর মাধ্যমে।

প্রথম কিছুদিন সেক্স করার আগে সাবধানতা অবলম্বন করুন। নিজের আঙ্গুল দিয়ে আগে পরিক্ষা করে দেখুন যে আপনার যোনি তে কোন ব্যথা অনুভব করেন কিনা। বাচ্চা জন্মের পর শরীর এ কিছু হরমোনাল তারতম্যের কারণে আপনার যোনি পথ আগের থেকে বেশি শুকনা হয়ে থাকতে পারে।তাই এই সময় প্রচুর পরিমানে বাড়তি lubrication ব্যবহার করতে পারেন যেমন lubricating jelly -( এটি যেকোনো ফার্মাসিতে আপনি পাবেন)।

শারীরিকভাবে প্রস্তুত হবার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সহবাসের মানসিক প্রস্তুতি।সহবাসের পূর্বে আপনার সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। তিনি এ ব্যাপারে কি চিন্তা ভাবনা করছেন তা খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন। একে অপরকে সময় দিন। আপনার পার্টনার এর কোন কিছু নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা আছে কিনা সেগুলো জানার চেষ্টা করুন।

আপনি সময় নিন। বাচ্চা জন্মের দুই মাস পর ও যদি আপনি ব্যাথা অনুভব করেন তাহলে অবশ্যই আপনার ডাক্তার এর সাথে দেখা করে ওনার পরামর্শ নিবেন। বেদনাদায়ক episiotomy  সেলাই এর জন্য চিকিৎসা রয়েছে। একজন obstetric physiotherapist  এর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

 

গর্ভনিরোধঃ

বাচ্চা জন্মের পর আপনার বাচ্চা কে বুকের দুধ খাওয়ানো অবস্থাতেই বা আপনার মাসিক আবার ফিরে  আসার আগেই আপনি আবার গর্ভবতী হয়ে পরতে পারেন। তাই সহবাস এর সময়  অবশ্যই জন্ম নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। আপনি হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার আগে আপনার ডাক্তার আপনাকে এই সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে দিবেন। আবার আপনি যখন ৬ সপ্তাহ পর চেক আপ এ যাবেন তখনও এই সম্পর্কে ডাক্তার এর সাথে বিস্তারিত আলাপ করে নিবেন।  

 

গর্ভনিরোধ  গাইড লাইনঃ

জন্মনিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা আপনাকে যৌন বাহিত রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়না তবে আপনি বাচ্চা নিতে চান কিনা বা চেলে কখন বাচ্চা নিতে চান এই সমস্ত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে থাকে।

শুধুমাত্র কনডম যৌন বাহিত রোগ এবং প্রেগ্নান্সি দুটো থেকেই সুরক্ষা দেয়। তাই আপনি অন্য যেকোনো জন্ম নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থাই গ্রহন করুন না কেন, আপনার ও আপনার পার্টনার এর স্বাস্থ্য রক্ষারতে অবশ্যই কনডম ব্যবহার করবেন।   

 

কোথায় পাবেন?

বিভিন্ন জায়গায় আপনার গোপনীয়তা রক্ষা করে আপনি গর্ভনিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং অনেক জায়গায় বিনামুল্যেও পেতে পারেন। এমনকি ১৬ বছরের নিচের কিশোর কিশোরীরাও এই সুবিধা পেতে পারেন। তবে অবশ্যই তাদের এই সম্পর্কে পরিপক্ক জ্ঞ্যান  এবং বুদ্ধি থাকতে হবে।

যেসব জায়গায় আপনি বিনামুল্যে গর্ভনিরোধ পেতে পারেনঃ

ফার্মেসি, হাসপাতাল বা আপনি আপনার চিকিৎসকের কাছেও পেতে পারেন।

কমিউনিটি গর্ভনিরোধ ক্লিনিক।

স্বাস্থ্য ক্লিনিক (এখানে যৌন বাহিত রোগের পরিক্ষাও করা হয়ে থাকে)।

আপনার ডাক্তার বা কোন ক্লিনিক এ যোগাযোগ করার আগে অবশ্যই আপনার গর্ভনিরোধ সম্পর্কে ভালো জ্ঞ্যান থাকা প্রয়োজন। মানুষের সময় সুযোগ, জীবন ধারা ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, কে কোন গর্ভনিরোধ ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।

 

গর্ভনিরোধ ও রজবন্ধ বা মেনোপজঃ

নারীদের যখন মাসিক বন্ধ হয়ে যায় সেই সময় টাকে বলা হয় রজবন্ধ বা মেনোপজ। মহিলারা যদি যৌন মিলন করেন এবং বাচ্চা না চান তাহলে তাদের অবশ্যই গর্ভনিরোধ ব্যবস্থা নিয়মিত ভাবে নিতে হবে, যদিনা তাদের ১২ মাস যাবত মাসিক বন্ধ থেকে থাকে(মেনোপজ)। এর কারন হল মাসিক একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে কিছুটা অনিয়মিত হয়ে পরতে পারে এবং এই সময় প্রেগ্নান্সির ঝুঁকি থেকে যায়। মেনোপজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।

 

গর্ভনিরধের স্বল্পস্থায়ী পদ্ধ্যতিঃ

গর্ভনিরোধের স্বল্পস্থায়ী পদ্ধ্যতি গুলো প্রত্যেকবার মিলনের সময় ব্যবহার করতে হয় অথবা নিয়মিত ভাবে প্রতিদিন ব্যবহার করতে হয়। এর ভিতর রয়েছেঃ  

কনডম-অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এবং যৌন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ  করার সবচেয়ে ভালো উপায় হল কনডম ব্যবহার করা। এটি ল্যাটেক্স রাবার অথবা প্লাস্টিক ( পলিইউরিন) দিয়ে তৈরি জন্মনিয়ন্ত্রক।এটি সহবাসের সময় শুধু পরিধান করলেই হয়। এর তেমন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও নেই।  বাচ্চা জন্মের পর কনডম ব্যবহার করাটা সবচাইতে সহজ গর্ভনিরোধ ব্যবস্থা। যদি আপনার মনে হয় যে আপনার বা আপনার সঙ্গীর কোন যৌন বাহিত রোগ থেকে থাকতে পারে তাহলে এই সময় অবশ্যই কনডম ব্যবহার করবেন।

 

পিল- আপনি যদি বাচ্চা কে বুকের দুধ না খাওয়ান তাহলে আপনি বাচ্চা জন্মের ২১ দিন পর থেকে COCP(combined oral contraceptive pill) খাওয়া শুরু করে দিতে পারেন। তবে আপনি যদি ২১ দিনের পর খাওয়া শুরু করেন তাহলে প্রথম সাত দিন আপনি সম্পূর্ণ ভাবে নিরাপদ থাকবেন না এবং তখন প্রথম সাত দিন আপনাকে কনডম ব্যবহার করতে হবে। বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ালে এই পিল ব্যবহার করবেন না কেনন এই পিল বুকের দুধ কমিয়ে দেয়।

 

ব্রেস্ট ফিডিং এর সময় Combined Oral Contraceptive Pill (COCP) গ্রহণ না করে Progesterone Only Pill (POP) গ্রহণ করার পরামর্শ  দেয়া হয়। এই পিল বুকের দুধ কমিয়ে দেয়না। এই পিল বাচ্চা জন্মের ২১ দিন পর থেকে খাওয়া শুরু করতে হবে। এই পিল প্রতিদিন একই সময় খেতে হবে। যদি ২১ দিনের পর পিল খাওয়া শুরু করেন তাহলে প্রথম দুই দিন আপনি সম্পূর্ণ ভাবে নিরাপদ থাকবেন না এবং তখন প্রথম দুই দিন আপনাকে কনডম ব্যবহার করতে হবে। এই পিল বাচ্চার কোন ক্ষতি করেনা। তবুও অনেক মহিলারাই বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় পিল ছারা অন্যন্য গর্ভনিরোধ ব্যবস্থা ব্যবহার করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

ক্যাপ-এগুলো বাচ্চা জন্মের ৬ সপ্তাহ পর থেকে ব্যবহার করা যেতে পারে। আপনি যদি আগে ক্যাপ ব্যবহার করে থাকেন, এখন হয়তো সেই সাইজ ঠিক হবেনা। তাই আপনার ডাক্তার এর সাথে চেক আপ এর সময় নতুন ক্যাপ লাগাতে হতে পারে।

 

গর্ভনিরধের দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধ্যতিঃ

গর্ভনিরোধের প্রতিবরতনযোগ্য দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধ্যতি বা LARC (Long-active reversible contraceptive methods) গুলো ৩ মাস থেকে ১০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকে। এগুলো তখনি উপযুক্ত যখন আপনি মনে করবেন যে স্বল্পস্থায়ী পধ্যতি গুলো নিয়মিত ভাবে নিতে আপনি ভুলে যেতে পারেন।  LARC এর ভিতর আছে-

IUCD(Intra uterine copper device)-এটি একটি T shaped copper device যেটি আপনার জরায়ু তে লাগিয়ে দেয়া হয়। এটি বাচ্চা জন্মের ৪ সপ্তাহ পর থেকেই লাগানো সম্ভব। এটি তাতখনিক ভাবে কার্যকর এবং বাচ্চা জন্মের পরকালিন চেক আপ এই আপনি এটি লাগিয়ে নিতে পারবেন। এটি আপনার বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে কোন রকম বাধা সৃষ্টি করবেনা।

Injection-গর্ভনিরোধ ইনজেকশন সাধারণত বাচ্চা জন্মের ৬ সপ্তাহ পরে দেয়া হয়ে থাকে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আগেও দেয়া যেতে পারে। এটি আপনার বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে কোন রকম বাধা সৃষ্টি করবেনা।

Contraceptive implant-এটি হচ্ছে একটি ছোট flexible plastic tube,৪০mm এর মতো লম্বা হয় যা আপনার বাহুর উপরের দিকে চামড়ার নিচে লাগিয়ে দেয়া হয়। এতে progesterone hormone থাকে। এটি ৩ বছর পর্যন্ত কার্যকর। এবং বাচ্চা জন্মের ২১ দিন পর থেকেই এটি লাগিয়ে দেয়া যেতে পারে।তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আগেও দেয়া যেতে পারে।যদি ২১ দিনের পর ইমপ্ল্যান্ট লাগানো হয় তাহলে পরবর্তী সাত দিন কনডম ব্যবহার করতে হবে। এটি আপনার বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে কোন রকম বাধা সৃষ্টি করবেনা।

 

About the author

Maya Expert Team

Leave a Comment