মেডিকো-লিগ্যাল সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট - মেডিকো লিগাল

ধর্ষণের পর চিকিৎসা পদ্ধতি

Written by Maya Expert Team

ধর্ষণের পর চিকিৎসা পদ্ধতি

যখন সকল শক্তি সহিংসতা বন্ধ করতে বিশেষত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা বন্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে তখন কাউকে কখনো কোনো ধরণের সহিংসতার শিকার হতে হবে না। এর আগে আমাদের এটিও নিশ্চিত করা আবশ্যক যে এই অপরাধমূলক কাজটি যে মানুষের সাথে করা হয়েছে তা চিহ্নিত করা এবং একটি ”স্বাভাবিক” জীবনের মানসিক যাতনা থেকে সে মানুষটিকে বের করে আনা।

ধর্ষণের মত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার ক্ষেত্রে যে বেঁচে যায় বা তার পরিবারের সদস্যদের জন্য এই আর্টিকেলটি ধর্ষণের পর চিকিৎসা পদ্ধতির একটি সারসংক্ষেপ। এটি শুধুমাত্র তথ্য দেয়ার উদ্দেশ্যে এবং রাষ্ট্রের আইন সাপেক্ষে এই পদ্ধতি পরিবর্তনও হতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো ডাক্তারদের শেখানোর কোন উদ্দেশ্যে মোটেও নয়। যোগ্য যে কেউ ব্লাস্ট (BLAST) এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ক প্রকাশনাগুলো দেখতে পারেন।

একটি নারীকে যে চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে সে সম্পর্কে অনেকের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। মানসিক অশান্তির সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন পুরুষ ডাক্তরা দ্বারা পরীক্ষিত হবার ভয় নারীদের যথাযথ চিকিৎসা এবং পরীক্ষার সুবিধা নিতে বাধা দেয়। এটি ধর্ষণের পর বেঁচে যাওয়া সে নারীকে শুধুমাত্র আরো দুর্বল এবং গর্ভবতী হওয়ার বড় ঝুঁকিতেই রাখেনা বরং এর সাথে তার ন্যায়বিচার পাওয়াকেও বাধাগ্রস্থ করে।

  • একজন ডাক্তারের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে ধর্ষণের শিকার হওয়া মানুষটির একটি লিখিত অনুমতি নেয়া। একজন ডাক্তার পরীক্ষা করতে, প্রমাণ সংগ্রহ করতে এবং একজন পুলিশকে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে অবহিত করতে এ লিখিত অনুমতির প্রয়োজন পড়ে।
  • সেই বেঁচে  যাওয়া মানুষটির প্রাথমিক চিকিৎসা যত দ্রুত দেয়া সম্ভব সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিৎ।
  • তার কাছ থেকে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ নেয়া। একজন ডাক্তারের জন্য এটা বাধ্যতামূলক যে তিনি সেই ব্যক্তির প্রতি সর্বোচ্চ সহানুভূতি দেখাবেন এবং এই সময়ে ঘটনা নিয়ে কোন ধরনের রায় বা অভিমত পোষনে যাবেন না। মনে রাখতে হবে ডাক্তারী পরীক্ষার সময় কোন অবস্থাতেই কোন পুলিশ কর্মকর্তা উপস্থিত থাকতে পারবেন না। তবে আক্রান্ত মানুষটির অনুমতি নিয়ে তার কোনো আত্মীয় সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেন।

১. সাধারণ তথ্য – নাম, বয়স, লিঙ্গ, সনাক্তকরণের দুটি চিহ্ন, এবং পুলিশ মামলার বিবরণ।

২. মেডিকেল ইতিহাস – পূর্ববর্তী যৌন এবং ধাত্রীবিদ্যার (গর্ভধারণ বা গর্ভাপাত ইত্যাদির সংখ্যা) ইতিহাস চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হতে পারে। এসটিডি (STDs), অস্ত্রপাচার বা সার্জারির ইতিহাস এবং পূববর্তী অপব্যবহারের ইতিহাস এ প্রসঙ্গে প্রয়োজন হতে পারে।

৩. যৌন হয়রানির ইতিহাস – বেঁচে যাওয়া ব্যক্তির নিজ ভাষায় নথিভুক্ত ঘটনার ইতিহাসের আইন আদালতে প্রামাণিক মূল্য রয়েছে যেহেতু এগুলো নিরপেক্ষ ডাক্তার দ্বারা নথিভুক্ত হচ্ছে। সেই ডাক্তারের এ বিবরণ সম্পূর্ণ নথিভুক্ত করা প্রয়োজন যেহেতু একজন বেচেঁ যাওয়া নারীর এটি প্রথম সুযোগ তার ঘটনা খুলে বলবার। হয়রানির স্থান, সময়, জোর করবার প্রকৃতি, যোগাযোগের এলাকা এ সমস্ত কিছু বিস্তারিত এখানে নথিভুক্ত করা হয়। যদি আক্রমনকারী পরিচিত হয় তাহলে জিজ্ঞেস করুন এবং আক্রমনকারীর নাম বলুন। যদি কোনো সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ পায় (যেমন আক্রমনকারীর পরিচয়) তাহলে তার পরিচয় নেয়াটা এবং তথ্যসরবরাহকরীর স্বাক্ষর নিয়ে রাখাটাই শ্রেয়।

  • ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ একটি বিস্তুৃত পদ্ধতি যাতে্ আক্রান্ত হওয়া মানুষটির কাছ থেকে একাধিক নমুনা নেয়া হতে পারে। হামলার প্রকৃতিই নির্দেশ করবে শরীরের কোন অংশ পরীক্ষা করা হবে। কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে তাকে ৪ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ পরীক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন ৭২ ঘন্টার পর তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। (৭২ ঘন্টা পরে শুক্রানু খুঁজে পাওয়া যাবে না কাজেই বীর্যের নমুনা তিন দিন পর নিয়ে কোন লাভ নেই )। তাই ঘটনার পর যত তাড়াতাড়ি পরীক্ষার ব্যবস্থা নেয়া যায় ততই ভাল।

১. যে এ ঘটনার শিকার হয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনার উপর নির্ভর করে শরীরের যেখানে যেখানে আক্রান্ত  হয়েছেন সে সে অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে।

২. আক্রান্ত মানুষটিকে একটি বড় কাগজের টুকরো উপর দাঁড়াতে অনুরোধ করুন যাতে গায়ে লেগে থাকা আলামত যেমন- ঘাস, কাঁদা, মাথার চুল এগুলো সংগ্রহ করা যায়। কেননা এগুলোর নমুনা সংগ্রহে থাকলে পরবর্তীতে অভিযুক্ত হামলাকারীর কাছ থেকে সংগ্রহ করা আলামতের সাথে মিলিয়ে অপরাধ প্রমাণ করা যেতে পারে । কাগজের এই টুকরোটি খুব সাবধানে গুছিয়ে রাখতে হবে এবং একটি ব্যাগে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে এবং প্রমাণ খুঁজে পাওয়ার জন্য  FSL এ পাঠাতে হবে।

৩. হামলার শিকার মানুষটি যে পোশাক পরে ছিলেন তার আলামত হিসেবে মূল্য রয়েছে। কেননা সেখানে কোনো ধরণের ধস্তাধস্তির চিহ্ন, রক্তের দাগ, অশ্রুজল বা বল প্রয়োগের চিহ্ন থাকতে পারে। তাই এসব আলামত মেডিকেল চিকিৎসা ম্যানুয়ালে সংরক্ষণ করার ব্যাপারে বিশেষ ভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সরবরাহকৃত চার্টে পোশাকের প্রতিটি টুকরোর বিবরণ লিপিবদ্ধ করুন। কোনো দাগের উপস্থিতি- বীর্য, রক্ত, বা অন্য যে কোন কিছু লেগে থাকলে যথাযথভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। পোশাকে কোনো অশ্রুজল বা অন্য কোনো দাগ থাকলে সেটাও উল্লেখ করুন। হামলার শিকার ব্যক্তি যদি সে পোশাক পরিবর্তন করে ফেলেন তাহলে তাকে অবশ্যই পরামর্শ দিতে হবে যেন তিনি হামলার সময় যে পোশাক পরে ছিলেন তা অবশ্যই সঠিক নিয়মে সংরক্ষণ করেন।

৪. আক্রান্ত মানুষটির পোশাক এবং শরীর থেকে আলামত সংগ্রহ করতে হবে। নখের আঁচড় এবং বিভিন্ন আঘাত থেকে নমুনা সংগ্রহ করা যেতে পারে।  

৫. আক্রান্ত মানুষটির কাছ থেকে রক্ত নিয়ে যৌন পরিবাহিত রোগ, মদ, মাদক এবং রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশের আইন মতে সরকার অনুমোদিত চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাই এ ধরণের পরীক্ষা করবেন যেখানে তাদের আক্রান্ত মানুষটির অভ্যন্তরীণ অঙ্গের পূর্ণ বিবরণ দিতে হয়।

মেডিকেল পরীক্ষাগুলোর মধ্যে একটি পদ্ধতি হচ্ছে  “দুই আঙুলের পরীক্ষা”  যা  সতীচ্ছেদ পর্দার  অবস্থা জানার জন্য একজন ডাক্তারের অবশ্যই করা প্রয়োজন। যারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে তাদের অনেকেই নিজেকে অপমানিত মনে করেন এবং এটা এড়ানোর জন্য আইনি সহায়তা নেয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। তবে বর্তমান আইন অনুযায়ী, একজন ধর্ষককে ধর্ষণের যেকোন প্রচেষ্টার জন্য সাজা দেওয়া যেতে পারে এক্ষেত্রে যদিও সে নারীর সতীচ্ছেদ পর্দা না্ও ছিড়ে থাকে তাও। বাংলাদেশের সৃপ্রিম কোর্ট অক্টোবর ২০১৩ সালে মানসিক আঘাত এবং শারীরিক অবস্থার যে কোন অবণতি হয়েছে এমন বেশ কিছু ‍দৃষ্টান্তকে আইনের চোখে অপরাধ বলে গ্রাহ্য করে বিচারের আওয়তায় নিয়ে এসেছে। বিশেষত বিতর্কিত “দুই আঙুলের পরীক্ষা” এর যথার্থতা অমীমাংসিত থাকার পরও ক্রমাগত এ পরীক্ষা চালিয়ে যা্ওয়ায় জনমনে ক্রোধের সৃষ্টি করেছে । সৃপ্রিম কোর্ট এর সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাসচিব এবং পুলিশ মহাপরিদর্শককে “দুই আঙুলের পরীক্ষা” চলতে থাকার যথার্থতাকে  চার সপ্তাহের মধ্যে ন্যায়সংগত করতে আদেশ দিয়েছে এবং এর অন্তর্বর্তী সময়ে এধরনের পরীক্ষা নিষিদ্ধ করেছে। এর ফলে এধরনের যে কোন ঘটনায় ধর্ষণের শিকার যে কেউ এখন ন্যায়বিচারের দাবী করতে পারবেন।

কোর্টের সিদ্ধান্তের ফল স্বরূপ ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি নতুন দিক নিদের্শনা খসড়া প্রণয়ন করেছে যা ধর্ষণের শিকার যে কারো উপর “দুই আঙুলের পরীক্ষা” চালানো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে ।

মেডিকেল পরীক্ষার পূর্বশর্ত

১. একটি ভীতিহীন, শান্ত এবং গোপনীয় জায়গায পরীক্ষা করা উচিত।

২. হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যাক্তির সঙ্গে থাকা আত্মীয়ের অপেক্ষা করাবার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকা উচিত।

৩. একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত আলো এবং আরামদায়ক টেবিল থাকা দরাকার।

৪. সময়ের সাথে সাথে যেহেতু প্রমাণ হারিয়ে যায় সেহেতু সমস্ত পদ্ধতি খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।

৫. ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) ১৬৪ অনুসারে কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসক এই পরীক্ষা করতে পারেন এবং করা উচিত।

৬. বেঁচে যাওয়া নারীর পরীক্ষার জন্য যদি কোনো নারী চিকিৎসক উপস্থিত না থাকেন তাহলে একজন নারী সহকারী বা কোন একজন নারীর উপস্থিতিতে একজন পুরুষ ডাক্তার এ পরীক্ষা করতে পারবেন। ছোট বা অক্ষম ব্যাক্তির ক্ষেত্রে তার পিতা-মাতা, গুরুজন বা যার সা্থে সে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এমন কেউ থাকতে পারেন।

চিকিৎসা

ধর্ষণের শিকার কোনো ব্যক্তির চিকিৎসা কোনো একক উদ্দেশ্যে করা হয় না। একজন চিকিৎসক একাধিক উদ্দেশ্যে এটি করে থাকেন। নিচে সেগুলো তুলে ধরা হলো-

১. আঘাতের চিকিৎসা

২. প্রফিল্যাক্সিস এবং যৌন পরিবাহিত রোগ পরীক্ষা করার জন্য

৩. প্রফিল্যাক্সিস এবং এইচআইভি পরীক্ষা করার জন্য

৪. যদি প্রযোজ্য হয তাহলে ইউনিরারি গর্ভাবস্থা পরীক্ষার জন্য

৫. জরুরী গর্ভনিরোধ

৬. কাউন্সেলিং

৭. দরকার হলে উচ্চ কেন্দ্রের নির্দেশ এবং তথ্য দেয়ার জন্য

৮. চিকিৎসার আওতায় রাখা।

এগুলোর সামগ্রিক উদ্দেশ্য হচ্ছে আঘাতের চিকিৎসা, যৌন পরিবাহিত রোগ ও গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা এবং এ ধরণের অত্যাচারের সাথে সম্পর্কিত মানসিক যাতনা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।

মেডিকেল রিপোর্ট বিশ্লেষণ

এটা সবসময় মনে রাখা উচিত যে সাধারণ পরীক্ষার ফলাফল জোরপূর্বক যৌন সঙ্গমকে খন্ডনও করেনা আবার নিশ্চিতও করে না। তাই অন্যান্য আলামত পরীক্ষার ফল বিবেচনায় নিয়ে আসা হয়। তবে আঘাতের অভাব বা পরীক্ষাগারের ভুলের কারণেও নেতিবাচক ফলাফল আসতে পারে। এক্ষেত্রে যে জিনিসগুলো বিবেচনা করা দরকার, সেগুলো হল-

১. নেশার কারণে অথবা ভয়ে আক্রমনকারীকে প্রতিরোধ করার অক্ষমতার জন্য

২. পরীক্ষার জন্য রিপোর্ট করতে দেরি করে ফেললে

৩. সময়ের সাথে সাথে শরীরের  আঘাতের চিহ্ন বা ক্ষতের নিরাময় হয়ে যেতে পারে

৪. বিভিন্ন কর্মকান্ড যেমন- প্রসাব করা, পরিষ্কার করা, গোসল করা, পোশাক পরিবর্তন ইত্যাদি কারণেও প্রমাণ মুছে যেতে পারে

৫. কনডম ব্যবহার করা, ভ্যাসেকটমি করে থাকলে বা Vas রোগ থেকে থাকলে

পরীক্ষার ফলাফল চূড়ান্ত করার সময় এই যুক্তি উল্লেখ করা একজন চিকিৎসকের অবশ্য কর্তব্য।

আরো তথ্যের জন্য  ২০১২ সালে BLAST কর্তৃক প্রকাশিত নিচের লিংকটি পরিদর্শন করুন-

manual for medical examination of sexual assault.

আরো তথ্যের জন্য-

Role of Doctors in the Criminal Proceedings of Bangladesh with Special

Reference to Women’s Access to Justice

About the author

Maya Expert Team

Leave a Comment