ডার্মাটোলজি

ত্বকের বিভিন্ন সমস্যাবলী

ত্বকের বিভিন্ন সমস্যাবলী
ত্বকের ৫টি সাধারণ সমস্যার কারণ ও তার চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে এখানে আলোচনা হয়েছে।


ওয়ার্টস বা আঁচিল
জীবনের কোনো একটি পর্যায়ে অধিকাংশ লোক ওয়ার্টসে আক্রান্ত হোন। সাধারণত ২০ বছর বয়সে এটি হয়ে থাকে।

ওয়ার্টস কি?
ওয়ার্টস হচ্ছে এক ধরনের মাংসল পিন্ড, যা ১ মিলিমিটার থেকে ১ সেন্টিমিটারেরও অধিক জায়গা জুড়ে বিস্তৃত থাকে। ওয়ার্টস যাকোন জায়গায় হতে পারে, তবে সাধারণত হাত ও পায়ে বেশি হয়ে পায়ের ওয়ার্টসকে ভেরুকা বলে। যৌনাঙ্গ বা তার চারপাশে অথবা মলদ্বারে ওয়ার্টস হতে পারে।

কি কারণে এটি হয়?
হিউমান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) এর সংক্রমণে ওয়ার্টস সৃষ্টি হয়, যা স্পর্শের মাধ্যমে থেকে ত্বকে ছড়িয়ে পরে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন জায়গা বা জিনিস, যেমন মেঝে বা মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে। যদি আপনি ওয়ার্টসে আক্রান্ত থাকেন, তাহলে ঘনিষ্ট স্পর্শের তা অন্য ব্যক্তির দেহে ছড়াতে পারে। সেই সাথে আক্রান্ত অংশ থেকে শরীরের অন্যান্য অংশেও ব্যপ্তি ঘটতে পারে।

চিকিৎসা
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওয়ার্টস নিজে নিজে দূর হয়ে যায়, তবে এরকম হতে ২ বছর পর্যন্ত সময় যেতে পারে। এর চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলোঃ

● প্রেসক্রিপশন ছাড়াই কিনতে পাওয়া যায় এমন ক্রীম বা মলম ও জেল (যৌনাঙ্গের জন্য প্রযোজ্য নয়) – আপনার জন্য কোনটি উপযুক্ত তা জানার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

● ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওয়ার্টের জন্য প্রযোজ্য রাসায়নিক পদার্থ

● ক্রায়োথেরাপি (শীতলকরণ) – প্রশিক্ষিত ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে ক্রায়োথেরাপি গ্রহণ করা অধিকাংশ সময় ত্বকের হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দ্বারা বহির্বিভাগের চিকিৎসা রূপে এটি হয়।

● অস্ত্রোপচার ও লেজার -আঁচিলের উপর ডাক্ট টেপ লাগালে উপকার পাওয়ার খুব কমই,এ জাতীয় চিকিৎসা ব্যথাময় হয় এবং আঁচিল আবার ফিরে আসতে পারে।

ডাক্তার দেখানো কি প্রয়োজন?
যদি ওয়ার্টসের কারনে যন্ত্রণাবোধ করেন এবং ডাক্তার এটির চিকিৎসা করুক এমনটি চান, চর্মরোগ বা ত্বক বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন। যদি জেনিটাল বা যৌনাঙ্গের ওয়ার্টসে আক্রান্ত তাহলে লজ্জাবোধ করে থাকলেও ডাক্তার দেখানো অত্যাবশ্যক, যাতে আপনি সঠিক ও চিকিৎসা পেতে পারেন।


ইম্পেটিগো
ইম্পেটিগো সাধারণত শিশু ও বাচ্চাদের হয়ে থাকে, তবে যে কেউ এতে আক্রান্ত হতে পারে। সাধারণত মুখ ও হাতে হয়ে থাকে। শিশুদের মধ্যে ডায়াপার পরিধানের অংশে এটি হয়।

ইম্পেটিগো কি?
ইম্পেটিগো হচ্ছে ত্বকের একটি প্রদাহ। এর ফলে ত্বকে ছোট ছোট ফোস্কা দেখা দেয় যা ফেটে হলুদ, স্যাঁতসেঁতে, চুলকানি ও যন্ত্রণাময় ক্ষত হয় ও শুকিয়ে গিয়ে ক্ষতের উপর কঠিন, শক্ত পড়ে যায়। নিচের অংশের ত্বক লালচে হয়ে জ্বলুনিপো হতে পারে।

কি কারণে এটি হয়ে থাকে?
কাটা-ছেঁড়ার জন্য অথবা বহিঃত্বকে কোন সমস্যা, যেমন একজিমার কারনে ত্বকের ক্ষতি হলে মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া ত্বকে প্রবেশ করে এবং ইম্পেটিগো সৃষ্টি হয়। ইম্পেটিগো আক্রান্ত সাথে সরাসরি সংস্পর্শে এলে এবং তোয়ালে ও বিছানার চাদর ভাগাভাগি করে ব্যবহার ইম্পেটিগো ছড়ায়।

চিকিৎসা
৩ সপ্তাহের মধ্যে ইম্পেটিগো নিজ থেকে দূর হয়ে যায়, তবে এটি উচ্চ মাত্রায় সংক্রামক অ্যান্টিবায়োটিক ক্রীম বা মলম অথবা ট্যাবলেট গ্রহণ করা উচিত যাতে দ্রুততার সাথে আরোগ্য করা যায়।

ডাক্তার দেখানো কি প্রয়োজন?
রোগ নির্ণয় ও অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের পরামর্শের জন্য ত্বক বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা করুন। গ্রহণের ৪৮ ঘন্টা পর অথবা ক্ষত শুকিয়ে যাওয়ার পর থেকে অধিকাংশ ব্যক্তির শরীরে এটি সংক্রামক হিসেবে থাকে না। সংক্রামণ হওয়া না থামা পর্যন্ত শিশুদেরকে স্কুল অথবা নার্সারিতে দেয়া বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত আপনি কি ইম্পেটিগোতে আক্রান্ত? এ সম্পর্কে মায়া ভয়েসে কথা বলুন অথবা এ সম্পর্কে জানতে ‘আপা কি বলে’ এই বিভাগে প্রশ্ন করুন।


সোরিয়াসিস
বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২,৮৫৭,৯৮৭ জন ব্যক্তি সোরিয়াসিসে আক্রান্ত থাকে। সাধারণত ১১-৪৫ বছর বয়সের মধ্যে এটি হওয়া শুরু হয়ে থাকে। বংশগতভাবে এ রোগ চলতে থাকে, সোরিয়াসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের এক-তৃতীয়াংশের নিকট আত্মীয়রা একই রোগে আক্রান্ত থাকে। সমস্যা সংক্রামক নয়।

সোরিয়াসিস কি?
সোরিয়াসিসের কারনে ত্বকে স্তরপূর্ণ, লাল দাগ দেখা যায়। এ দাগগুলো দেখতে উজ্জ্বল বা চকচকে হয় এবং এতে চুলকানি বা জ্বালা-যন্ত্রণা হয়। শরীরের যেকোন অংশ এটি হতে পারে, তবে হাঁটু এবং পিঠে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

কারণ
শরীরে উপস্থিত কিছু অ্যান্টিবডি ভুলে ত্বককে আক্রমণ করে এবং এতে অ্যান্টিবডি দ্রুততার সংখ্যাবৃদ্ধি করে ত্বকের উপর আস্তরণ সৃষ্টি করে। মদ্যপান, ধূমপান এবং কিছু বিশেষ ঔষধ, জ্বালা দূরকারী (যেমন ইবুপ্রোফেন) এবং বেটা-ব্লকার (হৃদরোগে ব্যবহৃত) প্রভৃতি গ্রহণের কখনো কখনো লক্ষণসমূহ খারাপ অবস্থা ধারণ করে। ঘনিষ্ট সংস্পর্শের দ্বারা এটি ছড়ায় না।

এর চিকিৎসা কি?
ক্ষতের তীব্রতার উপর এটি কমানোর চিকিৎসা নির্ভর করে। এর চিকিৎসা হলোঃ

  • ভিটামিন ডি অথবা ভিটামিন এ সমৃদ্ধ ক্রীম বা মলম
  • স্টেরয়েড ক্রীম বা মলম
  • পিচ বা আলকাতরার মিশ্রণ
  • ত্বকে অতিবেগুণি রশ্মি (আলট্রা ভায়োলেট বা ইউভি রশ্মি) প্রয়োগ করা।
  • মুখে খাওয়ার ঔষধ বা ইঞ্জেকশন গ্রহণ

ডাক্তার দেখানো কি প্রয়োজন?
ডার্মাটোলোজিস্টের (ত্বক বিশেষজ্ঞ) কাছেই অধিকাংশ লোক এর চিকিৎসা গ্রহণ আপনি কি সোরিয়াসিসে আক্রান্ত? এ সম্পর্কে মায়া ভয়েসে কথা বলুন অথবা এ সম্পর্কে জানতে ‘আপা কি বলে’ এই বিভাগে প্রশ্ন করুন।


রিং ওয়ার্ম বা দাদ
শিশুদের মধ্যে দাদ হতে বেশি দেখা যায়, তবে যে কেউ এতে আক্রান্ত হতে পারেন। মাথা, কুঁচকি, পা, নখ অথবা দাড়ি গজানোর অংশে দাদ হতে দেখা যায়।

দাদ কী?
রিং ওয়ার্ম বলতে কোনো কীট বোঝায় না, বরং এটি হলো অসংখ্য ছত্রাক দ্বারা সৃষ্ট সংক্রমণ, যা বা বৃত্তাকারে শরীরে দেখা যায়। এটি কয়েক মিলিমিটার বা কয়েক সেন্টিমিটার জায়গা দখল করে ক্ষত অথবা বৃত্তগুলো লাল অথবা রূপালি বর্ণের হয় এবং ফোসকা পড়ে ও সেখান থেকে ক্ষরণ হয়।

দাদ কেন হয়?
ছত্রাকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা একজিমা সৃষ্ট দাগ অথবা কোন ক্ষতের মাধ্যমে ত্বকে প্রবেশ করে। সংস্পর্শ অথবা আক্রান্ত ব্যক্তির তোয়ালে, বিছানার চাদর অথবা চিরুনী ব্যবহারের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তির দেহে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পোষা প্রানী থেকেও এটি ছড়াতে পারে।

দাদের চিকিৎসা কী?
ফার্মেসিতে প্রাপ্ত ছত্রাক নিরোধক মলম বা ক্রীম, পাউডার অথবা ট্যাবলেট ফলপ্রসূ হতে পারে। বেশি ব্যবহৃত মলমগুলো হচ্ছে টার্বিনাফাইন এইচসিআই (১%) (Terbinafine HCl (1%)) এবং মাইকোনাজোল মলম (Miconazole ointment) যা আক্রান্ত স্থানে দিনে ২ করে এবং ২ সপ্তাহ ব্যবহার করতে হয়।

ডাক্তারের কাছে যাওয়া কি প্রয়োজন?
দাদ হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত না হলে কিংবা ফার্মেসিতে থেকে ঔষধ গ্রহণের পর প্রদাহ না ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিৎ।

ভিটিলিগো বা শ্বেতীরোগ
ভিটিলিগোকে বাংলায় শ্বেতী বলা হয় যাতে বাংলাদেশের অনেক মানুষ আক্রান্ত হোন। এটি বয়সে হতে পারে, তবে প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই (৪৪%) ১১ থেকে ২০ বছর বয়সে আক্রান্ত হওয়া হয়। নারী বা পুরুষের ত্বকের বর্ণ যাই হোক না কেন এতে সবাই আক্রান্ত হতে পারে।

ভিটিলিগো কী?
ভিটিলিগোর কারণে ত্বকে বিবর্ণ সাদা দাগ পড়ে। এই দাগ শরীরের যেকোন অংশে হতে পারে, যেসব অংশ সূর্যরশ্মির সংস্পর্শে থাকে, যেমন মুখ ও হাত, সেখানে দাগ হতে বেশি দেখা যায়। এবং সাথে কালো, তামাটে ত্বকেও এটি দেখা যায়। ভিটিলিগোর কারণে মাথার চুল সাদা হয়ে যায়। দাগটি অথবা বড় হতে পারে, তবে এর আকার একই থাকতে পারে আবার বাড়তেও পারে। ঘনিষ্ট কারণে ভিটিলিগো অন্য ব্যক্তির দেহে ছড়িয়ে পড়ে না।

ভিটিলিগো কী কারণে হয়?
মেলানোসাইট নামক কোষ, যা ত্বকের বর্ণ নির্ধারণ করে, তার অভাবের কারণে শ্বেতীরোগ হয়। কোষগুলো নিম্নবর্ণিত কারণে অনুপস্থিত থাকতে পারেঃ
● ইমিউন সিস্টেম বা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সঠিকভাবে কাজ না করলে এবং কোষগুলোকে আক্রমণ করলে
● ত্বক কিছু বিশেষ ধরনের ক্যামিকেল বা রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসলে কিংবা রোদে পুড়ে অতিসক্রিয় থাইরয়েড গ্ল্যান্ড (হাইপারথাইরোডিজম)-এর সাথেও শ্বেতীরোগ হওয়া জড়িত।

ভিটিলিগোর চিকিৎসা
ত্বকের বর্ণ পুনরুদ্ধার ও শ্বেতী ছড়ানো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য চিকিৎসা প্রদান করা হয়ে থাকে। চিকিৎসা হলোঃ
● স্টেরয়েড ক্রীম (ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে)
● আল্ট্রাভায়োলেট এ রশ্মি (অতিবেগুণি রশ্মি বা ইউভিএ)
● দাগ দূর করার জন্য বর্ণিল ক্রীম বা মলম, যেগুলোর মধ্যে কিছু কিছু প্রেসক্রিপশনে দেয়া হয়ে থাকে।

যদি ভিটিলিগোর কারণে ত্বকের ৫০% এরও অধিক অংশ আক্রান্ত হয়, তাহলে প্রেসক্রিপশনে ক্রীম দ্বারা সুস্থ ত্বককে হালকা রঙের করার চিকিৎসা প্রদান করা হতে পারে। এ চিকিৎসা ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে গ্রহণ অত্যাবশ্যক। প্রেসক্রিপশন ব্যতীত যেসব ক্রীম ক্রয় করা হয় ত্বকের রঙ হালকা করার দাবি করে, সেগুলোতে ক্ষতিকর ক্যামিকেল বা রাসায়নিক পদার্থ তাই এ জাতীয় ক্রীম ব্যবহার এড়িয়ে চলা ভালো।

About the author

Maya Expert Team