ওভারিয়ান ক্যান্সার সনাক্তকরন

যদি আপনার ওভারিয়ান ক্যান্সারের কোন রকম লক্ষন দেখা দেয় তাহলে আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার ডাক্তারকে দেখান।

প্রথমে আপনার ডাক্তার আপনাকে আপনার লক্ষন, সাধারণ স্বাস্থ্য এবং আপনার পরিবারে কখনও কারো ওভারিয়ান অথবা স্তন ক্যান্সার হয়েছে কিনা তা নিয়ে জিজ্ঞেস করবেন।

এছাড়া আপনার ডাক্তার আপনার ডিম্বাশয় এবং গর্ভের অবস্থা দেখার জন্য যোনি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।আপনার রক্তের নমুনা পরীক্ষা করতে পারে অথবা আপনাকে আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান করার জন্য  বলতে পারেন। এছাড়া স্ত্রীরোগবিশারদ ওভারিয়ান ক্যান্সার নিশ্চিত করার জন্য এগুলো ছাড়াও আরও পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

রক্ত পরীক্ষা (CA125)

আপনার রক্তে CA125 এর পরিমাণ দেখার জন্য আপনাকে একটি রক্ত পরীক্ষা করতে হতে পারে। CA125 কিছু ওভারিয়ান ক্যান্সারের কোষ দ্বারা উৎপাদিত হয়। যদি আপনার রক্তে CA125 এর পরিমাণ অনেক বেশি থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনার ওভারিয়ান ক্যান্সার আছে।

তবে এটি শুধুমাত্র ওভারিয়ান ক্যান্সারের জন্য নির্দিষ্ট নয়, বরং অনেক ক্ষতিকর অবস্থার জন্য তৈরি হতে পারে। তাই আপনার রক্তে CA125 এর পরিমাণ বেড়ে গেলে তার মানে এই নয় যে আপনার ওভারিয়ান ক্যান্সার আছে।

আপনার স্ত্রীরোগবিশারদ অবশ্যই আপনার CA125 পরীক্ষা করবেন যদি আপনি ঘন ঘন নিচের সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হনঃ

  • পেট ফাঁপাবোধ হওয়া
  • খুব দ্রুত বোধ পেট ভরে যাওয়ার ভাব হওয়া
  • ক্ষুধা কমে যাওয়া
  • পেটে ব্যথা
  • ঘন ঘন প্রস্রাব করা

যদি আপনার বয়স ৫০ বা তার চেয়ে বেশি হয় অথবা আপনার যদি এই লক্ষণগুলো প্রতি মাসে ১২ বারের বেশি দেখা দেয় তাহলে CA125 পরীক্ষাটি আপনার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আপনি যদি ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যর জন্য আপনার ওজন হ্রাস হয়, আপনি ক্লান্তি বা পরিবর্তন অনুভব করেন, বা আপনার পায়খানার অভ্যাস বদলে যায় তাহলে আপনার ডাক্তার  নিয়মিত মেডিকেল চেকআপের জন্য CA125 পরীক্ষা করতে দেখতে পারেন।

আপনি যদি ৫০ বা তার চেয়ে বেশি হয়ে থাকেন এবং গত ১২ মাসে যদি আপনি পেট ফাঁপাবোধ হওয়া, পেটে ব্যথা বা আপনার পায়খানার অভ্যাসে পরিবর্তনের কারনে পেটের সমস্যা (আইবিএস) অনুভব করে থাকেন তাহলে ডাক্তার আপনার রক্তে CA125 এর পরিমাণ পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

ওভারিয়ান ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে নারীদের CA125 স্বাভাবিক স্তরে থাকে। যদি আপনার CA125 বাড়তে থাকে তাহলে আপনার ডাক্তার আপনাকে আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান করতে বলবেন।

আল্ট্রাসাউন্ড

আল্ট্রাসাউন্ড উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে আপনার ডিম্বাশয়ের একটি ছবি তৈরি করতে পারে। আপনি একটি অভ্যন্তরীণ আল্ট্রাসাউন্ড (এটি Transvaginal আল্ট্রাসাউন্ড নামে পরিচিত) করতে পারেন, যেখানে আল্ট্রাসাউন্ড প্রোব আপনার কোষে ঢোকানো হবে অথবা আপনি একটি বহিরাগত আল্ট্রাসাউন্ড করতে পারেন, যেখানে প্রোব আপনার পেটের পাশে রাখা হবে। ছবিটি আপনার ডিম্বাশয়ের আয়োতন ও জমিন এবং সেইসাথে কোন সিস্ট থাকলে তা প্রদর্শন করতে পারবে।

আরও পরীক্ষা

আপনার যদি ওভারিয়ান ক্যান্সার ধরা পড়ে তাহলে আপনার ক্যান্সার কতটুকু বড় হয়েছে এবং তা কতটুকু ছড়িয়ে পড়েছে তা দেখার জন্য আপনার আরও পরীক্ষা করা লাগতে পারে। এটিকে বলা হয় স্টেজিং (Staging)।

পরীক্ষাগুলো হলঃ

  • বুকের এক্স-রেঃ এর মাধ্যমে আপনার ফুসফুসে ওভারিয়ান ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে কিনা বা ফুসফুসের চারপাশে এক ধরনের তরল পদার্থ তৈরি হয়েছে নাকি তা দেখা যায়।
  • সিটি স্ক্যান বা এমআরআই স্ক্যানঃ এখানে আপনার বুক, পেট এবং শ্রোণীচক্রে ক্যান্সারের চিহ্ন আছে নাকি তা ছবির মাধ্যমে দেখা যায়।
  • পেটের তরল পরীক্ষাঃ যদি আপনার পেটে তরল পদার্থ তৈরি হয় এবং তা ফোলা দেখায় তাহলে বুঝতে হবে আপনার ওভারিয়ান ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে। এটি খুঁজে বের করার জন্য আপনার পেটে একটি পাতলা সুঁই ঢুকানো হবে এবং ক্যান্সারের কোষ পরীক্ষণের জন্য পেট থেকে তরল পদার্থের একটি নমুনা নেয়া হবে। এটি  আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্র বা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে করা যাবে।
  • ল্যাপেরস্কপি (Laparoscopy): এই ছোট অপারেশনটি করা হবে যখন স্ত্রীরোগবিশারদ আপনার ডিম্বাশয় আরও ভাল করে দেখতে চাবেন। একটি পাতলা নলের উপর ক্যামেরা দিয়ে আপনার ডিম্বাশয় পরীক্ষা করার জন্য আপনার তলপেটে (পেট) একটি ছোট কাটার মাধ্যমে সন্নিবেশিত করা হবে। আপনার  ডিম্বাশয় থেকে পরীক্ষণের জন্য একটি ছোট টিস্যুর নমুনা নেয়া হতে পারে (এটি  biopsy নামে পরিচিত)। যদি আপনার ডাক্তার পরীক্ষণের জন্য একটি Laparoscopy করার পরামর্শ দেন তাহলে তা ঠিক আছে কিন্তু সেটি যদি চিকিৎসার পদ্ধতি হিসেবে সুপারিশ করা হয় তাহলে তা আপনার করা উচিৎ নয়। আপনার যদি ডিম্বাশয় সম্প্রসারিত হয় তাহলে ল্যাপেরটমি (laparotomy) এর মাধ্যমে তা কেটে ফেলা যায়।  

 

স্টেজিং (Staging) এর মাধ্যমে আপনার ডাক্তার আপনার অবস্থার জন্য সঠিক চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে, শুধুমাত্র ওভারিয়ান ক্যান্সারের পর্যায় (stage) আপনার অবস্থার কিভাবে উন্নতি হতে পারে তা বলতে পারে না।

ওভারিয়ান ক্যান্সারের পর্যায় এবং শ্রেণীঃ

পর্যায় (stage)

যখন আপনার ওভারিয়ান ক্যান্সার নির্ণয় করা হয়, তখন ডাক্তার এর একটা পর্যায় দিবেন। এটি প্রায়ই অস্ত্রোপচার তথ্যের উপর ভিত্তি করে করা হয়। এর মাধ্যমে আপনার ক্যান্সারের আকার এবং কতদূর এটা ছড়িয়ে পড়েছে তার সম্পর্কে জানা যায়। ওভারিয়ান ক্যান্সারের সাধারণত চার ধরনের ব্যবহৃত পর্যায় আছেঃ

পর্যায় 1 – ক্যান্সার শুধুমাত্র এক অথবা উভয় ডিম্বাশয়কে প্রভাবিত করে।

পর্যায় 2 – ক্যান্সার ডিম্বাশয় থেকে শ্রোণীচক্র বা জরায়ু মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।  

পর্যায় 3 – ক্যান্সার পেটের আস্তরণ, অন্ত্র পৃষ্ঠ এবং শ্রোণীচক্রের মধ্যে লিম্ফ নোডে ছড়িয়ে পড়ে।

পর্যায় ৪ – ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অংশ যেমন লিভার, প্লীহা বা ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিটি পর্যায়কে আরও কিছু শ্রেণী যেমন A, B এবং C তে বিভক্ত করা যায়। আপনি কোন পর্যায়ে আছেন তা নিয়ে যদি আপনি নিশ্চিত না থাকেন, তাহলে আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন।

শ্রেণী (Grade)

ক্যান্সারের গ্রেড একটি মাইক্রোস্কোপের অধীনে কোষের অবস্থা দেখে বোঝা যায়।

কম গ্রেড – অস্বাভাবিক কোষগুলো যখন ধীর বর্ধনশীল থাকে তখনই সেগুলো লক্ষ্য করা যায়।

মধ্যপন্থী গ্রেড – কোষগুলো কম গ্রেড কোষের চেয়ে আরও বেশি অস্বাভাবিক দেখায়।

উচ্চ গ্রেড – কোষগুলো খুবই অস্বাভাবিক এবং দ্রুত বর্ধনশীল হয়।

ক্যান্সারের কোষ ধ্বংস করার জন্য সাইটোটক্সিক (cytotoxic) ড্রাগস্ ব্যবহার করা হয়। এটি প্রায়ই ওভারিয়ান ক্যান্সারের অস্ত্রোপচারের পরে দেয়া হয় কিছু ক্ষেত্রে, এটি  অস্ত্রোপচারের আগে দেওয়া হয় যাতে টিউমার সঙ্কোচন এবং সহজে অপসারণ করতে পারে একে নিওএডজুভেন্ট (neoadjuvant) কেমোথেরাপি বলা হয়

কেমোথেরাপিতে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওষুধের একটি সংমিশ্রণ দেয়া হয়। কোন ওষুধ কখন এবং কিভাবে দিতে হবে তা নির্ভর করে আপনার ক্যান্সার কোন পর্যায়ে আছে এবং কতটুকু ছড়িয়েছে তার উপর। সাধারণত ওভারিয়ান ক্যান্সারের জন্য যে চিকিৎসা করা হয় তার জন্য প্ল্যাটিনাম সম্বলিত ড্রাগ (carboplatin) ব্যবহার করা হয়, যেটা একা বা অন্যান্য ওষুধ যেমন প্যাক্লিটেক্সেল (paclitaxel) এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয়।   

কেমোথেরাপি সাধারণত শিরার মধ্যে একটি ড্রিপ হিসাবে দেওয়া হয়, তবে এটি কখনও কখনও ট্যাবলেট হিসাবে দেওয়া হয়। কিছু গবেষণায় কেমোথেরাপি সরাসরি পেটে দিতে দেখা গিয়েছে। একে ইন্ট্রাপেরিটনিএল (intraperitoneal) কেমোথেরাপি বলা হয়।এই মুহূর্তে বাংলাদেশে এই  কেমোথেরাপি অনুশীলন করা হচ্ছে না, কিন্তু ক্লিনিকাল ট্রায়ালে এটি মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আপনাকে বহির্বিভাগের রোগী হিসেবে কেমোথেরাপি দেয়া হবে। কিন্তু কখনও কখনও আপনাকে কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে হতে পারে। এটি সাধারনত একটি চক্রের মাধ্যমে দেয়া হয় যেখানে একটি নির্দিষ্ট সময় বিশ্রাম নেয়ার পর পর চিকিৎসা দেয়া হয় যাতে আপনার শরীর সুস্থ থাকে। বেশীর ভাগ মহিলারাদেরকে ছয় চক্রের কেমোথেরাপি দেয়া হয়।

কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াঃ


কেমোথেরাপির প্রধান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক, সুস্থ কোষ যেমন ইমিউন কোষের উপর এর প্রভাবের জন্য হয়ে থাকে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলঃ

  • সংক্রমণ
  • ক্ষুধা কমে যাওয়া
  • বমি বমি ভাব
  • গ্লানি
  • চুল পড়া 
  • মুখে ক্ষত হওয়া

অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আপনার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ক্যান্সারের কেমোথেরাপির জন্য যা ফিরে আসে

ওভারিয়ান ক্যান্সার চিকিৎসার পর আবার  ফিরে আসতে পারে (relapse)। যদি সেটা হয় তাহলে আপনাকে কেমোথেরাপির আরেকটি কোর্স দিতে হবে। এটি একই রকম ওষুধ অথবা বিভিন্ন ওষুধের সমন্বয়ে দেয়া হতে পারে। একে বলা হয় সেকেন্ড লাইন ট্রিট্মেন্ট (second-line treatment)। আপনার আগের চিকিৎসার জন্য যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোই আবার ব্যবহার করা হবে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং উপকারিতা নিয়ে আপনার ডাক্তার আপনার সাথে আলোচনা করবেন।

উচ্চ শক্তি এক্স-রে যেমন কেমোথেরাপি দ্রুত বর্ধনশীল ক্যান্সারের কোষের দিকে লক্ষ্য করে কাজ করে। রেডিওথেরাপি প্রায়ই ওভারিয়ান ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু মাঝে মাঝে, মাল্টিডিসিপ্লিনারি টীম এটি ওভারিয়ান ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য খুব নির্দিষ্ট পরিস্থিতির অধীনে সুপারিশ করতে পারেন।

ওভারিয়ান ক্যান্সারের চিকিৎসায় অনেক উন্নতি এসেছে। বেশির ভাগ নারীরা এখন দীর্ঘজীবী হচ্ছে এবং কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভুগছে। এই অগ্রগতি ক্লিনিকাল ট্রায়ালে আবিষ্কার করা হচ্ছে যেখানে নতুন ওষুধ এবং ওষুধের সমন্বয়ের মধ্যে তুলনা করা হচ্ছে মানসম্মত চিকিৎসার মাধ্যমে।   

ক্যান্সারের রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এটি অনেক মানসিক ও ব্যবহারিক সমস্যা বয়ে আনতে পারে।

আপনার অনুভূতি বা সমস্যা নিয়ে কথা বলতে যেকোনো প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা বা Therapist এর সাহায্য নিতে পারেন। আপনি আপনার অসুস্থতার যে কোনো পর্যায়ে সাহায্য চেতে পারেন। আর এর জন্য বিভিন্ন ধরনের উপায় আছে।

আপনার ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বা স্ত্রীরোগবিশারদ আপনাকে পরামর্শদাতার (counsellor) কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। আপনি যদি এরকম মনে করেন তাহলে আপনার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। এন্টিডিপ্রেসেন্ত (Antidepressant) ওষুধের কোর্স এক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু তার আগে আপনি যেকোনো counsellor অথবা সাইকোলজিস্ট (psychologist) এর সাথে দেখা করে নিন।

ছবি সূত্রঃ slideteam.net

0 comments

Leave a Reply