কেন অতিরিক্ত বসে থাকা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

কেন অতিরিক্ত বসে থাকা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর
আমরা সবাই জানি যে আমাদের আরো কর্মঠ হওয়া উচিৎ, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে আমাদের বসে থাকাও কমানো উচিৎ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে আপনি দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করলেও অতিরিক্ত বসে থাকা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে অতিরিক্ত বসে থাকার সাথে মুটিয়ে যাওয়া এবং স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, কয়েক ধরনের ক্যান্সার এবং অপরিণত বয়সে মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার সাথে মেটাবলিজম হ্রাস পাওয়ার সম্পর্ক আছে বলে ধারণা করা হয়, যা দেহে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, রক্তচাপ এবং দেহের চর্বির গলানোর সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। আমাদের অনেকই দৈনিক ৭ ঘণ্টার বেশি বসে বা শুয়ে কাটাই এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটা ১০ ঘণ্টা বা তারও বেশি বেড়ে যায়। এর মধ্যে টিভি দেখা, কম্পিউটার ব্যবহার করা, পড়া, বাড়ির কাজ করা, কার, বাস বা ট্রেনে ভ্রমণ করা – ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু ঘুমানোর সময়টা এই হিসাবের মধ্যে ধরা হয় না।

বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে দীর্ঘক্ষণ বসে বা শুয়ে থাকায় এমন কিছু নির্দিষ্ট বিষয় আছে যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। একটি গবেষণা অনুসারে যারা দীর্ঘক্ষণ বসে বা শুয়ে থাকেন, তারা ডায়াবেটিস, কার্ডিওভাস্কুলার ইভেন্ট, এবং কার্ডিওভাস্কুলার ইভেন্টের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে বেশি থাকেন।


কতক্ষণ বসে থাকাকে অতিরিক্ত বসে থাকা বলে?
নিজেদেরকে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখতে আমাদের নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিৎ – সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট। আমাদের বসে বা শুয়ে থাকার সময়ও কমানো উচিৎ। একজন মানুষের প্রতিদিন কতক্ষণ পর্যন্ত বসে থাকা উচিৎ, সেই সীমা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানা যায় না। এই ঝুঁকি অতিরিক্ত ওজনের মত স্বাস্থ্যগত কিছু ফ্যাক্টরের উপর নির্ভর করে এবং একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, অতিরিক্ত বসে থাকা মেটাবলিজমের হ্রাস ঘটায়; যা আমাদের রক্তে চিনি, রক্তচাপ, এবং ফ্যাট নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে এবং পেশী ও হাড়কে দূর্বল করে দিতে পারে।


বয়স ভিত্তিক পরামর্শ
এই পরামর্শগুলো সব বয়সি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং বয়স ভিত্তিক ব্যায়ামের পরামর্শগুলো ক্রমানুসারে বিবেচনা করা উচিত।

  • ৫-বছরের কম বয়সি

৫-বছরের কম বয়সি বাচ্চাদের জন্য পরামর্শ থাকবে তারা যেন টিভি দেখায়, গাড়িতে, বাসে বা ট্রেনে ভ্রমনে, এ বেশি সময় ব্যয় না করে। এটা ক্রমশ প্রমাণিত হচ্ছে যে বাল্য বয়সে বসে থাকার অভ্যেস অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার এবং বুদ্ধিমত্তার বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার সাথে সম্পর্কিত। যদিও ব্যস্ত মা-বাবার জন্য একাজ করা খুব চ্যালেন্জিং, তবু আমাদের সচেতন থাকতে হবে কারণ ছোট বয়সের অভিজ্ঞতা এবং অভ্যাস প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও আমাদের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকতে ছোট বেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনাচরণ অনুসরণ করা প্রয়োজন, যেমন দোলনা, গাড়ির সিট, হাই চেয়ার, ওয়াকিং এইড বা বেব বাউন্সারে কম সময় কাটানো, টিভি বা অন্য স্ক্রিনের সামনে কম সময় কাটানো।

  • শিশু এবং যুবক-যুবতি

গবেষণায় দেখা গিয়েছে যেসব বাড়িতে একের অধিক টিভি বা কম্পিউটার আছে, সেসব বাড়ির শিশু এবং যুবকের বেশি সময় বসে কাটায়। ৫ থেকে ১৮ বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে বসার সময় কমাতে বাসা, শ্রেণীকক্ষ এবং নিজ এলাকার এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বসে থাকা কমানোর জন্য পরামর্শ:

-পারিবারিকভাবে দৈনিক টিভি দেখা বা কম্পিউটার ব্যবহার করার সময় নির্দিষ্ট করার সিদ্ধান্ত নিন
-শোয়ার ঘরকে টিভি এবং কম্পিউটার মুক্ত রাখুন
– বাচ্চাদেরকে আরো কর্মঠ করতে ‘নো স্ক্রিন টাইম’ চালু করুন
– বাসার কাজে বাচ্চাদেরকে উৎসাহিত করুন, যেমন- টেবিল সাজানো, ডাস্টবিন বাসার বাইরে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি
– বাচ্চাদের জন্য এমন উপহার পছন্দ করুন যেগুলোর সাথে শারীরিক পরিশ্রম জড়িত, যেমন- স্কেট শুজ, ক্রিকেট সেট, ফুটবল, বাইসাইকেল, ঘুড়ি        ইত্যাদি
– মা-বাবারা নিজারা নিজেদের বসার সময় কমিয়ে সন্তানদের জন্য উদাহরণ তৈরি করতে পারেন

  • প্রাপ্তবয়স্করা কী করবেন

১৯ থেকে ৬৪ বছরের প্রাপ্তবয়স্কদের কাজের জায়গায়, বাসায় বা ভ্রমণের সময় সারা দিনই যতটা সম্ভব কম বসার চেষ্টা করা উচিত। বসার সময় কমানোর জন্য পরামর্শ:

– ট্রেনে বা বাসে দাঁড়িয়ে থাকুন
– সিঁড়ি ব্যবহার করুন
– প্রতি ৩০ মিনিট পর পর উঠে দাড়ানোর কথা মনে করার ব্যবস্থা করুন
– বসার পরিবর্তে দাঁড়িয়ে কাজ করুন
– ল্যাপটপ একটি বাক্সের উপর রাখুন যাতে দাঁড়িয়ে কাজ করা যায়
– চা বা কফি বিরতির সময় হাঁটার জন্যও বিরতি নিন
– ইমেইল বা কল করার পরিবর্তে আপনার সহকর্মীর টেবিলে হেঁটে যান
– টিভি দেখার পরিবর্তে ওই সময়ে শারীরিক পরিশ্রমের কোন কাজ বা শখের কোন কাজ করুন

  • বেশি বয়স্ক যারা

কিছু বয়স্ক ( যাদের বয়স ৬৫ বা তার উপর) মানুষ দৈনিক ১০ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় বসে বা শুয়ে কাটিয়ে দেয়, এজন্য এরা সবচেয়ে বেশি বসে থাকা মানুষের দল। এটা কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া বা অসুস্থ্যতার কারণে হতে পারে, কিন্তু এটা সামাজিক নিয়মেও পরিণত হয়েছে যেখানে বয়স্ক মানুষদের ধীর হয়ে যাওয়া এবং বিশ্রামে থাকাটাই আশা করা হয়। তবে এটা স্বাস্থ্যের জন্য ভাল নয়। বয়স্কদের দীর্ঘক্ষণ ধরে বসে থাকার সময়টা কমানো উচিত। বসার সময় কমানোর জন্য পরামর্শ:

-টিভি বা কম্পিউটারের সামনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা থেকে বরত থাকুন
-টিভিতে বিজ্ঞাপন বিরতির সময় উঠে দাঁড়ান এবং হাঁটুন
-ফোনে কথা বলার সময় দাঁড়ান বা হাঁটুন
-যতটা সম্ভব সিঁড়ি ব্যবহার করুন
– পরিশ্রম করতে হয় এমন কোন শখ যেমন বাগান করা বা নিজে নিজে কিছু করার চেষ্টা করুন
– দল নির্ভর কাজ যেমন- ডান্স ক্লাস, হাঁটার দল ইত্যাদিতে যোগ দিন
– নাতি-নাতনির সাথে খেলাধুলা করুন
– বাসার কাজকর্ম করুন।

0 comments

Leave a Reply