ঘাড় ব্যাথা

ঘাড় ব্যাথা

ঘাড় ব্যথা করা বা ঘাড় নাড়াতে না পারা (stiff neck) একটি সাধারণ সমস্যা এবং সাধারণত এর ফলে বিচলিত হওয়ার মত কিছু হয়না। সচরাচর এটি ঘাড়ের নরম টিস্যু আহত হওয়ার কারণে হয়। ঘাড়ে ব্যাথা এবং ঘাড় নাড়াতে না পারার সমস্যাটি কয়েকদিনের মধ্যেই ভাল হতে শুরু করে, এগুলো ঘাড়ের বড় ধরনের কোন সমস্যার লক্ষণ নয়। আপনি বেকায়দা ভঙ্গিতে ঘুমালে, অনেকক্ষণ ধরে কম্পিউটারের কীবোর্ড ব্যবহার করলে, বা প্রচন্ড গরমে বসে থাকলেও ঘাড় ব্যাথা বা ঘাড় নাড়াতে সমস্যা হতে পারে। মানসিক চাপ এবং দুশ্চিন্তার কারনেও অনেক সময় ঘাড়ের মাংসপেশিতে চাপ (tension) তৈরি হতে পারে, যার কারনে ঘাড় ব্যথা শুরু হতে পারে। আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘাড় ব্যাথার নির্দিষ্ট কোন কারন নেই এবং ডাক্তারেরাও বিষয়টিকে অনির্দিষ্ট বা ‘non-specific’ বলে আখ্যা দেন।

বাড়িতে ঘাড় ব্যাথার উপশম করা
যে কারনেই ঘাড় ব্যাথা হোক, আপনার জন্য একটাই উপদেশ – দিনের স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যান, সচল থাকুন এবং বেদনানাশক ওষুধ বা পেইন কিলার খান। আরও সুনির্দিষ্ট পরামর্শের জন্য নিচের তালিকাটি দেখুন।

  • নিয়মিত ডোজে প্যারাসিটামল খান – ট্যাবলেট খাওয়ার বদলে ঘাড়ে ইবুপ্রোফেন (ibuprofen) জেলও লাগাতে পারেন। ওষুধের সাথে দেয়া নির্দেশিকা অনুযায়ী ওষুধের ডোজ নির্ধারণ করুন।
  • ঘাড়ে গরম পানির বোতল বা হিট প্যাক (heat pack) ধরে থাকার চেষ্টা করুন – এটি ব্যথা কমাতে ও মাংসপেশির খিঁচুনি (muscle spasms) কমাতে সাহায্য করে।
  • রাতে একটি শক্ত নরম বালিশে ঘুমান – দুটি বালিশ ব্যবহার করবেন না, কারন এতে শোয়ার সময় ঘাড় অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে থাকতে পারে।
  • শোয়ার ভঙ্গি ঠিক করুন – বাজে ভঙ্গিতে শুয়ে থাকলে ঘাড় ব্যাথা আরও বাড়তে পারে এবং আসলে হয়ত এই কারনেই আপনার ঘাড় ব্যাথা করা শুরু করেছিল।
  • ঘাড়ের কলার (neck collar) পরা এড়িয়ে চলুন -ঘাড়ে কলার (neck collar) পরে থাকলে তা ঘাড় ব্যাথা ভাল করতে সহায়তা করে তার কোন প্রমান নেই, এবং ঘাড় ইচ্ছে মত নাড়ানো যায় এমনভাবে রাখাটাই ভাল।
  • ঘাড় ব্যাথা ও আড়ষ্টভাব না যাওয়া পর্যন্ত গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকুন – এসময় আপনি হয়ত ঘাড় ঘুরিয়ে রাস্তার যানবাহন দেখতে পারবেন না।
  • ঘাড় নাড়াতে সমস্যা হলে বা বেঁকে থাকলে সহজ কিছু ঘাড়ের ব্যায়াম করে দেখতে পারেন, মাথা উপরে-নিচে এবং ডানে-বামে এমনভাবে নাড়ান যাতে ঘাড়ের পেশিতে সামান্য চাপ পড়ে। এই ব্যায়াম আপনার ঘাড়ের মাংসপেশি আরও শক্তিশালী করবে এবং আপনার ঘাড় বিভিন্ন দিকে ঘোরানোর ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।


কখন ডাক্তার দেখাবেন
যদি কয়েকদিন যাওয়ার পরও ঘাড় ব্যাথা ভাল না হয় বা ঠিক ভাবে নাড়াতে না পারেন এবং যদি আপনার দুশ্চিন্তা হয় অথবা যদি সাধারন পেইন কিলার খেয়ে ব্যাথা না কমে তাহলে ডাক্তার দেখান। ডাক্তার বড় ধরনের কোন সমস্যা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হতে আপনার ঘাড় পরীক্ষা করে দেখবেন এবং আপনাকে কিছু প্রশ্ন করবেন। তিনি হয়ত আপনার কিডনির কর্মক্ষমতা অনুযায়ী আপনাকে কিটোরোলাক (ketorolac) বা ডাইক্লোফেনাক (diclofenac) ভিত্তিক আরও কড়া কোন পেইন কিলার খেতে দিবেন। যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘাড় ব্যাথা থাকে তাহলে আপনার ডাক্তারকে বলুন আপনাকে যেন কোন ফিজিথেরাপিস্টের ঠিকানা দেয় বা রেফার করে।


ঘাড় বেঁকে গেলে বা আঁটকে গেলে
কোন কোন ব্যক্তি হঠাৎ একদিন সকালে উঠে দেখেন যে তাদের ঘাড় একদিকে বেঁকে আছে এবং তারা সেটি নাড়াতে পারছেন না। একে অ্যাকিউট টরটিকোলিস (acute torticollis) বলে। ঘাড়ের পেশিতে আঘাত পেলে এমনটা হয়। অনেকক্ষণ ধরে ঠাণ্ডার মধ্যে থাকলে বা ঘাড় কোন কারনে অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে থাকলে টরটিকোলিস হতে পারে। চিকিৎসার জন্য এবং বড় কোন সমস্যা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাক্তারের কাছে যান । অ্যাকিউট টরটিকোলিস ভাল হতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত লাগতে পারে, তবে সাধারনত এটি ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভাল হয়ে যায়। উপরে দেয়া পরামর্শগুলো অনুযায়ী বাড়িতে এর শুশ্রূষা করতে পারেন। তবে এর উপসর্গগুলো ৪৮ ঘণ্টার বেশি থাকলে ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রাখুন। ডাক্তার আপনার ঘাড় পরীক্ষা করবেন, এবং প্রয়োজনে আরও চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দিবেন।


ঘাড়ের স্নায়ু বা হাড়ের সমস্যা
কখনো কখনো ঘাড়ের হাড় এবং জয়েন্টগুলো ক্লান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারনে ঘাড় ব্যাথা করতে পারে। এটি এক ধরনের আরথ্রাইটিস, যাকে সারভিকাল স্পন্ডিলাইসিস (cervical spondylosis) বলে। সারভিকাল স্পন্ডিলাইসিস বয়সের কারনে হয়। সাধারণত এর বিশেষ কোন উপসর্গ দেখা দেয় না, তবে কারো কারো ক্ষেত্রে হাড়ের পরিবর্তনগুলোর কারনে ঘাড় নাড়াতে সমস্যা হতে পারে। আশেপাশের নার্ভ বা স্নায়ুগুলোও এসময় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার কারনে বাহুতে ব্যাথা এবং হাত পায়ে সূচ ফোটানোর মত যন্ত্রনা বা অবশভাব দেখা দিতে পারে। স্নায়ু ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারনে ঘাড় ব্যাথা করলে তাকে সারভিকাল রেডিকুলোপ্যাথি (cervical radiculopathy) বলে। ঘাড় বেকায়দা ভঙ্গিতে ধরে রাখলে, শরীর অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাঁকালে, বা ভাইব্রেটিং পাওয়ার টুল (vibrating power tools) ব্যবহার করলে এরকমটা হতে পারে।

এই ব্যাথা উপরে দেয়া পরামর্শগুলো মেনে চললে কমতে পারে। ছোট্ট একটা পাশবালিশ (যেগুলো সাধারণত নবজাতকদের জন্য ব্যবহার করা হয়) ঘাড়ের নিচে নিয়ে ঘুমান, যাতে আপনার ঘাড় টান টান (extended position) হয়ে থাকে।

তবে যদি এর উপসর্গগুলো না যায় তাহলে আপনাকে হয়ত MRI করতে বলা হবে। আপনি একজন অর্থোপেডিক ডাক্তারের সঙ্গেও কথা বলে দেখতে পারেন।

0 comments

Leave a Reply