চুলের যত্ন মনোসামাজিক সৌন্দর্য চর্চা

অ্যালোপেশিয়া (টাক)

Written by Maya Expert Team

টাক পড়াকে চিকিৎসাবিদ্যার ভাষায় সাধারণত অ্যালোপেশিয়া বলা হয়।

টাকের প্রকারভেদ

টাকের সমস্যা নানা ধরনের হয় এবং প্রত্যেক প্রকার টাকের সমস্যার নির্দিষ্ট লক্ষণ ও কারণও আছে। এরমধ্যে কিছু বেশ পরিচিত টাকের সমস্যা নিয়ে নিচে আলোচনা করা হল।

পুরুষালি এবং মেয়েলি টাক

পুরুষালি টাক সবচেয়ে বেশি পরিচিত টাকের সমস্যা। পুরুষদের সাথে সাথে, অনেক সময় নারীরাও এই সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন (মেয়েলি টাক)। এই সমস্যার সাথে মানিয়ে চলা পুরুষ এবং নারী – উভয়েরই জন্য বেশ কঠিন।

পুরুষালি টাকে এক কিনারা থেকে চুল পড়তে থাকে এবং পরবর্তীতে তালু ও কপালের পাশ থেকে চুল পড়ে যায়। মেয়েলি টাকের ক্ষেত্রে শুধু মাথার তালুতে চুলের পরিমাণ কমে যায়। পুরুষালি এবং মেয়েলি টাককে এন্ড্রোজেনিক বা এন্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেশিয়াও বলা হয়। পুরুষালি টাক সাধারণত বংশানুক্রমে হয়ে থাকে, তবে মেয়েলি টাকের ক্ষেত্রে এক কথা প্রযোজ্য কিনা তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটা (Alopecia areata)

অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটায় ছোপ ছোপ আকারে চুল পড়ে এবং আবার গজায়। এটা যেকোন বয়সে হতে পারে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ২০ বছরের কম বয়সি মানুষকে এতে বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যায়। ধরে নেয়া হয়, মানব দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সমস্যার কারণে এটি হয়ে থাকে। আরো ধরে নেয়া হয়, মানুষ এই সমস্যা জিনগত ভাবেও পেয়ে থাকে। এই সমস্যাটি হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১ বছর পর আবার চুল গজায়।

স্কারিং অ্যালোপেশিয়া (Scarring alopecia)

স্কারিং অ্যালোপেশিয়া, যা সিকেট্রিশাল অ্যালোপেশিয়া নামেও পরিচিত, স্বাস্থ্য বিষয়ক কোন জটিলতার কারণে হয়ে থাকে। এই ধরনের টাকে চুলের গ্রন্থিকোষ (ত্বকের ছোট ছিদ্র, যেখান থেকে একটি চুল গজায়) সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এর অর্থ হচ্ছে, ত্বকের এই স্থান হতে আর কখনো চুল গজাবে না।

লাইক্যান প্ল্যানাস ( এক ধরনের চুলকানি- ফুসকুড়ি, যা শরীরের নানা অংশকে আক্রান্ত করে) এবং ডিসকয়েড লুপাস (এক ধরনের হালকা প্রদাহ, যা ত্বককে আক্রান্ত করে। এর ফলে ত্বকে শল্কাকার দাগ পড়ে এবং টাক তৈরি হয়) ইত্যাদি অসুখের কারণে স্কারিং অ্যালোপেশিয়া হতে পারে।

অ্যানাজেন এফ্লুভিয়াম (Anagen effluvium)

অ্যানাজেন এফ্লুভিয়াম এক ধরনের টাক যা আপনার মাথার ত্বক, মুখমন্ডল এবং শরীরকে আক্রান্ত করতে পারে। এই ধরনের টাকের একটি অতি সাধারন কারণ হচ্ছে ক্যান্সারের চিকিৎসা (কেমোথেরাপি)। এক ধরনের ক্যাপ, যা মাথার ত্বককে ঠান্ডা রাখে, পরিধানের মাধ্যমে কেমোথেরাপি দ্বারা সৃষ্ট টাকের পরিমাণ কমানো যায়। যদিও, মাথার ত্বক ঠান্ডা রাখার এই ক্যাপ সবসময় কার্যকর হয় না এবং এটি সব জায়গায় পাওয়াও যায় না।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে অ্যানাজেন এফ্লুভয়ামের প্রভাব স্বল্পমেয়াদি। কেমোথেরাপি নেওয়া শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরেই আপনার চুল গজানো শুরু করবে।

গর্ভাবস্থায় টাক

সন্তান জন্মদানের পরেও নারীদের টাকের সমস্যা দেখা দিতে পার। এটি একটি সাধারণ ঘটনা, কারণ গর্ভাবস্থায় নারীদের চুল পড়ার মাত্রা কম যায়। ফলে, স্বাভাবিকভাবে যে চুল পড়ার কথা ছিল, সন্তান জন্মদানের পরে সেই চুলগুলো পড়ে যায়। অন্যদিকে, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (Polycystic ovary syndrome বা PCOS) আছে এরকম নারীদের হরমোনের তারতম্যের কারণে টাক দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসা

সাধারণ টাকের সমস্যাগুলোতে, যেমন- পুরুষালি টাকের ক্ষেত্রে কোন চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হয় না, কারণ এটি বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ঘটা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা স্বাস্থ্যের জন্য কোন হুমকিও সৃষ্টি করে না।

তবে, যে কোন ধরনের টাকই পীড়াদায়ক হতে পারে, তাই যদি আপনি এই বিষয় নয়ে চিন্তিত থাকেন তবে আপনি একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন। যদি শারীরিক সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য আপনি পুরুষালি টাকের চিকিৎসা করাতে চান, তবে ফিনাস্টারাইড (finasteride) ও মিনোক্সিডিল (minoxidil) নামক ঔষধ ব্যবহার করতে পারেন। মেয়েলি টাকের চিকিৎসাতেও মিনোক্সিডিল ব্যবহার করা যেতে পারে। মনে রাখবেন, এই ঔষধগুলো সবার জন্য কার্যকর নয় এবং যত দিন ঔষধ খাবেন তত দিনই আপনি উপকার পাবেন।

অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটার চিকিৎসায় সাধারণত স্টেরয়েড ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়, যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ক্রিম, জেল বা মলম ব্যবহার করা যেতে পারে। ইমিউনোথেরাপি নামক একধরনের পদ্ধতিও ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে, ক্ষতিগ্রস্থ ত্বকে ইচ্ছাকৃতভাবে একধরনের এলার্জির সংক্রমণ ঘটানোর মাধ্যমে চুল গজানোকে ত্বরান্বিত করা হয়।

টাকের চিকিৎসায় কিছু শল্যচিকিৎসামূলক পথও খোলা আছে, যেমন- লেজার থেরাপি, চুল প্রতিস্থাপন এবং নকল চুল সংস্থাপন। যদি আপনার অতিরিক্ত টাক পড়ে, তবে আপন একটি পরচুলা পরতে পারেন।

সমস্যাটির মানসিক বিভিন্ন দিক

টাকের সাথে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে। আপনার মাথার চুল, আপনার পরিচয় নির্মানের একটি অতিব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এতে আপনি নিজেকে কিভাবে দেখেন বা অন্যরা আপনাকে কিভাবে দেখুক বলে আপনি চান, তার প্রতিফলন ঘটে।

যদি আপনার টাক পড়া শুরু হয়, তবে আপনার মনে হতে পারে আপনি আপনার পরিচয়ের একটি অংশ হারাচ্ছেন। এটা আপনার আত্মবিশ্বাস কময়ে দিতে পারে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিষণ্নতা তৈরি করতে পারে।

আপনি একটি এমন ধরনের একটি দলে যোগ দিতে পারেন যারা একই সমস্যা ভুগছে এবং তাদের সাথে কথা বলতে পারেন। এর জন্য অনলাইন ফোরামের সাহায্য নিতে পারেন। আপনি মায়া ভয়েস দিয়ে শুরু করতে পারেন। এই অবস্থায় আপনাকে সাহায্য করার জন্য আপনি একজন থেরাপিস্ট বা একজন কাউন্সেলরের সাথে কথা বলতে পারেন। যদি কিভাবে শুরু করবেন তা আপনি না জানেন, তবে সবসময় মায়া আপা কি বলেন- এই বিভাগে পরামর্শ চাইতে পারেন।

About the author

Maya Expert Team