চুলের যত্ন মনোসামাজিক সৌন্দর্য চর্চা

চুলের যত্নে প্রাকৃতিক সমাধান

প্রায় প্রত্যেক ঋতুতেই চুলের সমস্যা দেখা দেয়। চুল পড়া, শুষ্ক চুল, চুল পাতলা হওয়া, আগা ফেটে যাওয়া প্রভৃতি বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। মূলত রাসায়নিক সমৃদ্ধ চিকিৎসা, রং করা, চুলের স্টাইলিংয়ে ব্যবহৃত জিনিসপত্র অথবা জেল সর্বদা ব্যবহারের কারণে চুল শুষ্ক ও ক্ষতির শিকার হয়। আপনি কী এসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন? বিশেষজ্ঞরা সবসময় হারবাল বা ভেষজ উপাদান ব্যবহার করার কথা বলে থাকেন। চুলের যত্নে ব্যবহৃত ভেষজ ও বাসায় তৈরি প্রতিকারক প্রাকৃতিক। এবং এটি রাসায়নিক সমাধান থেকে বসি পছন্দনীয় হয়ে থাকে। এসব প্রতিকারক সস্তাও হয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে চুলের যত্ন নেয়ার মত বাসায় সহজে প্রস্তুত ও ব্যবহার করা যায় এমন সমাধান নিচে দেয়া হলো।

১. আমলা ও মেহেদী

আমলা থেকে তাজা রস তৈরি করে শ্যাম্পু করার আগে তা চুলের গোড়াতে দিন এবং ২০ মিনিট রাখুন। এ পন্থা চুল পড়া রোধে ও খুশকির সমস্যা দূর করতে খুবই কার্যকর।

নারিকেল তেলের সাথে লেবুর রস মেশান এবং চুল ধোয়ার আগে মিশ্রণটি চুলে দিন। খুশকি জনিত চুল পড়া নিয়ন্ত্রণে এটি সাহায্য করে। আমলা অথবা লেবুর রস আধা ঘন্টার বেশি সময় চুলে দিয়ে রাখবেন না।

২. মেহেদী

মাসে অন্তত একবার মাথায় মেহেদী দিন। বাংলাদেশে মেহেদী হচ্ছে চুলের যত্নে ব্যবহৃত এমন উপাদান যা বহু বছর ধরে চলে আসছে। মা, দাদীরাও মেহেদী দ্বারা চুলের যত্ন করার পরামর্শ দেন। সেই সাথে, প্রাকৃতিক রং হিসেবেও মেহেদী কাজ করে। চুলে মেহেদী দেয়ার আগে হাতে গ্লাভস পরে নিবেন এবং ১ ঘন্টার বেশি সময় ধরে প্যাকটি চুলে রেখে দিবেন না। বারবার মাথায় মেহেদী দেয়া ও দীর্ঘক্ষণ রেখে দেয়ার কারণে চুল পাতলে হওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৩. নারিকেল

ঝুরি করে কাটা নারিকেলের টুকরো হতে দুধ / রস বের করে নিন। চুলের গোড়া ও চুল ম্যাসাজ করার মাধ্যমে দুধ মাথার ত্বকে লাগিয়ে নিন। তারপর একটি উষ্ণ তোয়ালে দিয়ে মাথার চুল ঢেকে নিন। ৩০ মিনিট পর শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। শুষ্ক ও হালকা চুলের জন্য নারিকেলের দুধ খুবই ভালো।

৪. মেথি

মেথি/ মেথি-গাছ চুল পড়ার সমস্যা দৃশ্যত কমিয়ে দেয়। মাথার ত্বক ও চুলের গোড়ায় মেথি/ মেথি-গাছ প্রয়োগ করুন। তা শুকাতে দিন এবং পরে শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। কন্ডিশনার ব্যবহার করতে ভুলবেন না কারণ মেথি চুলকে শুষ্ক করে তুলতে পারে।

৫. রিঠা এবং শিকাকাই

মাঝে মধ্যে মাথার ত্বকে রিঠা দিন। খুশকি নাশক হিসেবে রিঠা খুবই কার্যকর। মেথির মতো এটি ব্যবহার করা যায়।

শিকাকাই একটি প্রাকৃতিক শ্যাম্পু, সাধারণ শ্যাম্পুর মতোই এটি চুল পরিষ্কার করে। শিকাকাই দিয়ে চুল ধোয়া হলে তা চুল পড়া রোধে ও চুলকে উজ্জ্বল করে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

৫. তেল

চুল ও মাথার ত্বকের খাদ্য হচ্ছে তেল। চুলের ধরণ যাই হোক না কেন, ১-২ দিনের ব্যবধানে চুলে তেল দেয়া প্রয়োজন।

১:১ অনুপাতে ক্যাস্টর ওয়েল ও নারিকেল তেল একত্রে মিশিয়ে মাথার ত্বক ও চুলে প্রয়োগ করুন। এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ ওয়েল তেল দিয়েও চুলে ম্যাসাজ করতে পারেন। এটি চুলের জন্য খুব ভালো ময়েশ্চারাইজার। গরম তেল ম্যাসাজ করাও একটি ভালো কাজ। নারিকেল তেল গরম করে নিয়ে তা চুল ও মাথার ত্বকে লাগান। রাতে একটি নিশ্চিন্ত ঘুমের পর সকালে ওঠে চুল ধুয়ে নিন। ভিটামিন ই তেলও চুলের জন্য উপকারী – অন্যান্য তেল গুলোর সাথে এটি যুক্ত করে নিতে পারেন।

৬. দই

দই হচ্ছে একটি ভালো প্রাকৃতিক চুল মসৃণকারী এবং চুল উজ্জ্বলকারী কন্ডিশনার। দই এ উপস্থিত এনজাইম খুশকির বিরুদ্ধে মোকাবেলা করে এবং যন্ত্রণাময় মাথার ত্বককে শীতলতা প্রদান করে। শুধু সাধারণ টক দই অথবা এর সাথে ডিমের সাদা অংশ মিশিয়ে মিশ্রণটি চুলে লাগিয়ে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন। তারপর শ্যাম্পু দিয়ে মাথা ধুয়ে নিন।

৭. অ্যালোভেরা (ঘৃতকুমারী)

চুলের অনেক সমস্যার জন্য একটি সমাধান হচ্ছে ঘৃতকুমারী। এতে উপস্থিত এনজাইম সরাসরি চুলের বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। ঘৃতকুমারীতে চমৎকার আর্দ্রতা প্রদানকারী বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা প্রাকৃতিক কন্ডিশনারের মতো চুলকে গভীরভাবে আর্দ্র করে তোলে। ঘৃতকুমারীর শীতলতা প্রদানের গুণ যন্ত্রাণাযুক্ত মাথার ত্বককে আরোগ্য প্রদানেও কার্যকর।

৮. ভিটামিন ও খনিজের সম্পূরক

সুস্থ মাথার ত্বক ও শক্তিশালী চুলের জন্য শরীরের প্রয়োজন পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ। এগুলোর মধ্যে জিংক ও ভিটামিন ই চুলের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যদি আপনার শরীরে ভিটামিনের স্বল্পতা থাকে তাহলে তার ফলাফলে চুল পড়া সৃষ্টি হয়। এমনকী জ্বর থেকে সেরে উঠার পরও চুল পড়তে পারে।  এমন পরিস্থিতিতে ভিটামিন এ, ই, বি কমপ্লেক্স এবং খনিজ সম্পূরক, বিশেষ করে জিংক গ্রহণ করতে পারেন। রঙিন ফল ও শাকসব্জি, অর্থাৎ সবুজ পাতাযুক্ত সবজী, কুমড়া, খরমুজ এবং গাজরে ভিটামিন এ থাকে।

অন্যান্য উৎসসমূহ হচ্ছে মাংস এবং শুকনো ফল। ভিটামিন ই- এর প্রাকৃতিক উৎস গুলো হলো বাদাম, বীজ, টমেটো, পুঁইশাক ও উদ্ভিজ্জ তেল। প্রত্যেক ধরনের ভিটামিন বি’ এর উৎস আলাদা আলাদা খাবার, তবে সবচেয়ে ভালো উৎস হচ্ছে ফলিক এসিড যা পূর্নাঙ্গ দানার (হোল গ্রেইন) পাউরুটি ও সিরিয়ালে থাকে। ভিটামিন বি এর জন্য প্রচুর পরিমাণে হোল গ্রেইন শস্য, আলু, কলা, মটরশুটি, ডাল, সবুজ পাতাযুক্ত সবজী এবং গুড় গ্রহণ করুন। মাংস, সিরিয়াল, খোলসযুক্ত শামুক, বাদাম ও বীজ থেকে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় জিংক পেতে পারেন। আমাদের ডাক্তার ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে যেকোন পরামর্শের জন্য মায়া আপা- তে আপনার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করুন।

৯. ডিম

মাথার ত্বকে ডিমের সাদা অংশ লাগিয়ে ২০-৩০ মিনিট রেখে দিন। শুষ্ক ও ভেঙ্গে যাওয়া চুলের জন্যও ডিমের কুসুম উপকারী। যেকোন ধরণের ডিমের প্যাক মাথায় লাগানোর পর শ্যাম্পু করে মাথা ধুয়ে নিন।

ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম কীভাবে পৃথক করবেন তা শিখুনঃ ডিমের সাদা অংশ কীভাবে আলাদা করবেন

১০. প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ খাবার

চুল কোলাজেন নির্মিত হওয়ায় প্রোটিনের স্বল্পতা চুল পড়া সৃষ্টি করে। মটরশুঁটি, পশু পণ্য, যেমন মাংস ও দুগ্ধজাতীয় খাদ্য যোগ করে খাবারকে প্রোটিন সমৃদ্ধ করুন।

চুলের বৃদ্ধিতে বায়োটিন ও ভিটামিন বি কমপ্লেক্স প্রয়োজন। B3-এর মাত্রা ত্বকে রক্ত প্রবাহ সঞ্চালিত করে, যা চুলের বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। ছোলা, সবুজ মটর, ভূট্টা এবং সবুজ সবজির মতো খাবার গ্রহণ করুন।

ভিটামিন এ চুলে চমৎকার উজ্জ্বলতা সৃষ্টি করে কেননা চুলের গ্রন্থিকোষের চর্বি সংশ্লেষণে এটি কাজ করে চুলের বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। ভিটামিন এ যুক্ত খাবারগুলো হচ্ছে সবুজ পাতাযুক্ত সবজি, কুমড়া ও পেঁপে।

চুল সাদা হয়ে যাওয়া রোধে গাজর অপরিসীম সাহায্য করে। মেলানিন রঞ্জক হ্রাস পাওয়া, অত্যন্ত ক্রোধ, বিষণ্ণতা, মানসিক চাপ, দুঃখ, ঠান্ডা লাগা, রোদের সংস্পর্শে একটানা অনেক সময় থাকা, জীনগত কারণ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অতিমাত্রায় কফি ও চা পান প্রভৃতি কারণে চুল সাদা হয়ে পড়ে। চুলের হারিয়ে যাওয়া মেলানিন ফিরিয়ে আনতে গাজর সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি।

লৌহ সমৃদ্ধ ফল ও খাবার গ্রহণ করুন। লোহা চুল পড়া রোধে সাহায্য করে। খাবারে আপেল, বীট-পালং যোগ করুন কেননা এগুলো লোহাতে পরিপূর্ণ।

১১. প্রচুর পানি পান করুন

চুলের গঠনে এক-চতুর্থাংশ পানি থাকে। তাই প্রচুর পরিমাণে পানি পান চুল ও মাথার ত্বক উভয়ের জন্য উপকারী।

১২. বদভ্যাস ত্যাগ করুন

মদ্যপান চুলের বৃদ্ধি রোধ করে। মাথার ত্বকে রক্তপ্রবাহ ধূমপানের কারণে ব্যাহত হয় যার ফলাফল দাঁড়ায় চুলের বৃদ্ধি কমে যাওয়া। তাই ভালো চুলের জন্য এইসব অভ্যাস ত্যাগ করুন।

১৩. মাথার ত্বক ও চুল পরিষ্কার রাখুন

চুলের যত্নে একটি অবশ্য পালনীয় কাজ হচ্ছে মাথার ত্বক ও চুল পরিষ্কার রাখা। মাথার ত্বক ও চুল নোংরা রাখলে চুল পড়া বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত চুল ধোয়া খুব প্রয়োজন। দৈনিক চুল ধোয়ায় ব্যবহৃত নিয়মিত শ্যাম্পুর পাশাপাশি একটি হালকা শ্যাম্পু রাখুন। হালকা শ্যাম্পুর রঙ স্বচ্ছ এবং সিলিকন শ্যাম্পুর চেয়ে কম ঝাঁঝালো হয়।

১৪. পানির তাপমাত্রা

গরম পানি দিয়ে গোসল চুলের জন্য ভাল নয়। খুব বেশী গরম পানি চুলের জন্য ক্ষতিকর। এটি চুলের গোড়াকেও দুর্বল করে দেয়। স্বাভাবিক পানি বা কখনও কখনও অল্প গরম পানি দিয়ে চুল পরিষ্কার করুন। যখনি সম্ভব চুল পরিষ্কার করার শেষে খুব ঠান্ডা পানি দিয়ে করুন, কারণ তা মাথার ত্বকের অতিরিক্ত রন্ধ্র বন্ধে সাহায্য করে।

১৫. মাথার ত্বকে ম্যাসাজ

দৈনিক মাথার ত্বকে ম্যাসাজ করুন কেননা এতে মাথার ত্বকে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি করে তা চুলের গ্রন্থিকোষে পাঠায় যাতে চুলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। প্রতিদিন ম্যাসাজ করতে তেল ব্যবহার করতে হবে না। তেল ছাড়া মাথার ত্বকে বৃত্তাকার গতিতে শুধুমাত্র আঙ্গুলে চালিয়ে ম্যাসাজ করতে পারেন।

About the author

Maya Apa Expert Team