আবেগীয় স্বাস্থ্য মনোসামাজিক মানসিক স্বাস্থ্য

পরীক্ষার ভয় , করো জয় !

যে কোনো ধরণের পরীক্ষা, সেটা এমনকি এ লেভেল, ও লেভেল এর সময়ও, স্কুল জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় বলেই ধরে নেয়া যায়। স্কুলের পরে এক্সট্রা টিউশন, আবার রাত জেগে পড়াশোনার চাপ তোমাকে দুর্বল করে দিতে পারে। আর তার ফলে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারো, আর এর জন্য শেষে এত কষ্ট করেও পরীক্ষায় সন্তোষজনক গ্রেড পাওয়া হবে না।

পরীক্ষার আগে চাপ কমানোর জন্য মায়া টিম কিছু পরামর্শ দিতে পারে তোমাকে –

১। পরীক্ষার চাপের লক্ষণগুলো চিহ্নিত করো

কি কি লক্ষণ তৈরি হয় পরীক্ষার চাপের, সেটা চিহ্নিত করো সবার আগে। যেসব পরিক্ষার্থী চাপের মধ্যে থাকে তাদের মেজাজও খিটখিটে হয়ে যায়। তাদের হয়তো পর্যাপ্ত বা আরামদায়ক ঘুম হয় না, ক্ষুধামন্দা হয়, অনেক বেশি চিন্তা করে আর চেহারাতেও বিষণ্ণতা বা নেতিবাচকতার ছাপ পড়ে। অতিরিক্ত চাপ থেকে মাথা ব্যথা আর পেটে ব্যথাও কিন্তু হয়। তোমার পরিবার, তোমার স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় বা কাজের জায়গায় সবাই হয়তো আকাঙ্ক্ষা করে যে তুমি ভালো করবে, আর সেটা হয়তো এখন তোমার কাছে ভার বলে মনে হচ্ছে। তোমার হয়তো ভয় হচ্ছে যে তুমি অতটা ভালো নও, কিংবা যতটা প্রয়োজন ততটা প্রস্তুতি নাওনি। কারো সাথে যদি তোমার কাজের ব্যাপারে কথা বলতে পারো, তাহলে একটু হলেও ভালো লাগবে। বাবা-মা, বন্ধু বা শিক্ষকদের সহযোগিতা একজন কিশোর বা কিশোরীর চিন্তাকে হাল্কা করতে পারে এবং দৃষ্টিভঙ্গি নিবিষ্ট রাখতে সাহায্য করে। প্রত্যেকেরই চাপ সহ্য করার ক্ষমতা ভিন্ন। কারো কারো জন্য অল্প একটু চাপ সহ্য করাই হয়তো কঠিন হয়ে যায়, আর কেউ কেউ হয়তো একটু চাপের মধ্যে থাকলেই উদ্দীপনা খুঁজে পায়। সঠিক মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে থাকলে একটু-আধটু চাপ বরং সহায়কই হয়, কারণ এতে করে তুমি হয়তো অনেক ভালো করার তাগিদ অনুভব করবে। যদি তোমার মনে হয় যে তুমি আর চাপ নিতে পারছো না, তাহলে তোমার শিক্ষকের সাথে কথা বলো। পরীক্ষার আগে তোমাকে যেভাবেই হোক ফুরফুরে মেজাজে থাকতে হবে।

২। ভালো খাবার খাও

স্বাস্থ্যের জন্য সুষম খাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তোমার পরীক্ষার চাপ কমাতেও সেটা অবশ্যই সহায়ক হবে। হাই-ফ্যাট, হাই-সুগার, হাই-ক্যাফেইন যুক্ত খাবার ( কোলাজাতীয় পানীয়, মিষ্টি, চকোলেট, বার্গার, চিপস ইত্যাদি) তোমাকে হাইপারঅ্যাক্টিভ ( hyperactive) , খিটখিটে আর মেজাজী করে তুলতে পারে। তোমার খাবারে কি কি অবশ্যই থাকতে হবে তার একটা তালিকা নিচে দেয়া হলো –

ফল – সকালের নাস্তায়, যখন তোমার শরীর শক্তি ফিরে পাবার জন্য অধীর হয়ে আছে, সে সময় যদি একটা ফল খেতে পারো তাহলে তুমি দ্রুত সতেজ অনুভব করবে। বিশেষ করে পরীক্ষার দিনগুলোতে এটা তো আরও সহায়ক।

শস্যদানাযুক্ত খাবার – সিরিয়াল বা ওটমিলকে সাধারণত সকালের নাস্তার খাবার হিসেবে ধরা হয়, তবে দিনের যে কোনো সময়ই তুমি তা খেতে পারো। এতে করে তোমার মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা বাড়বে।

মাছ এবং তাজা সবজি – মাছ এবং কতিপয় তাজা সবজি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের উৎকৃষ্ট উৎস যা মস্তিষ্কের কার্যক্রম – বিশেষ করে স্মৃতিশক্তি ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য- সহায়ক।

পানি – পানি তোমার দেহের অঙ্গ আর পেশীসমূহকে সচল রাখতে সাহায্য করবে। পানিশূন্যতার ( dehydration) একটা লক্ষণ হচ্ছে মানসিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা। শক্তিবর্ধক পানীয় ( energy drink) নয়, বরং বিশুদ্ধ পানি পান করো। শক্তিবর্ধক পানীয়তে যে ক্যাফেইন থাকে তা বরং আরও ক্ষতি করে, কারণ তা তোমার স্নায়ুতন্ত্রকে বেশি সচল করে দিতে পারে যার ফলে একটা নির্দিষ্ট কাজে মনোনিবেশ করা কঠিন হতে পারে।

৩। পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমাও

পর্যাপ্ত ঘুম তোমার চিন্তাশক্তি আর মনোযোগের ক্ষমতাকে বাড়াবে। বেশিরভাগ কিশোর-কিশোরীরিই কিন্তু প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। পড়াশোনার মাঝখানে একঘণ্টা বা আধাঘণ্টার জন্য বিরতি নাও। ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছু সময়ের জন্য টিভি দেখতে পারো কিংবা কম্পিউটারে বসতে পারো, তাতে ঘুম আসার আগে মাথা থেকে একটু হলেও চাপ কমবে। পরীক্ষার আগের রাতে গড়গড় করে সব পড়া মুখস্ত করাটা একটা খারাপ অভ্যাস। যদি তুমি ক্লান্তি বোধ করো, তাহলে তোমার চিন্তাও অনেক বেশি বেড়ে যাবে। যদি তোমার ঘুম আসা নিয়ে সমস্যা হয়, তাহলে শক্তিবর্ধক খাবার (যেমন চা, কফি, অ্যালকোহল ইত্যাদি) খাওয়া কমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করো। আর ঘুমাতে যাওয়ার আগে যেন একটু হলেও বিনোদনমূলক কিছু করতে পারো সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পরীক্ষার আগ-মুহুর্ত পর্যন্ত টানা পড়ে যাওয়ার চেয়ে পর্যাপ্ত ঘুমই বেশি উপকারী হবে।

৪। পড়াশোনাকে সহজ করে ফেলো

তোমার বাবা-মা কিংবা পড়ালেখার সঙ্গীকে বলতে পারো তোমাকে রিভাইজ এর ক্ষেত্রে সাহায্য করার জন্য। রিভিশনের একটা সময়তালিকা বানিয়ে নাও, প্রয়োজনে স্কুলের সাহায্য নাও। স্কুলের বন্ধুরা মিলে দলবেঁধেও পড়ালেখা করতে পারো। এটা তোমাকে রিভিশনের ক্ষেত্রে সাহায্য তো করবেই, পরীক্ষা সংক্রান্ত চাপ বা দুশ্চিন্তা নিয়েও আলোচনা করে তুমি টেনশনও কমাতে পারবে একটু হলেও। কখনো কখনো অনেকেই কে কি ভাববে মনে করে নিজের ভয়ের কথা মুখ খুলে বলতে চায় না। কিন্তু আসলে তো সবারই একই অবস্থাই থাকে।

৫। নার্ভাস হওয়াটাই কিন্তু স্বাভাবিক!

মনে রেখো যে নার্ভাস হওয়াটাই স্বাভাবিক। নার্ভাসনেস হচ্ছে পরীক্ষার চাপের প্রতি একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

কিন্তু, যেটা করতে হবে, তা হলো এই স্নায়বিক চাপকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে হবে। তুমি যা যা জানো তা মনে রাখো এবং কতটুকু সময় তুমি পড়াশোনার পেছনে দিয়েছো তা ভাবো। তাহলে তোমার আত্মবিশ্বাসও বাড়বে। কিভাবে রিলাক্স থাকতে হয় সেটা জানতে হবে। সোজা-সাপ্টা, কার্যকর ও আত্ম-সহায়ক কৌশলগুলোই পরীক্ষার জন্য সবচেয়ে সহায়ক, এমনকি যখন তুমি পরীক্ষার হলে আছো তখনও।

চাপ কমানোর জন্য যে সকল রিলাক্সেশন টেকনিক তুমি অনুসরণ করতে পারো –

চোখ বন্ধ করে ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নাও

যেসব পেশীতে চাপ অনুভব করছো, সেগুলোকে শিথিল করার চেষ্টা করো। কল্পনা করো যে টেনশনটা কমে যাচ্ছে।

শরীরের প্রতিটা অংশের চাপ শিথিল করো – পায়ের পাতা থেকে মাথা পর্যন্ত।

শরীরের প্রতিটা অংশে মনোনিবেশ করতে করতে উষ্ণতা, ভার আর শিথিলতার কথা ভাবো।

৬। অল্পস্বল্প ব্যায়াম করো

প্রত্যেকেরই একটু বিরতির দরকার হয়। তবে পরীক্ষা চলে এসেছে দেখেই খেলাধুলা বা আর সব সামাজিক দেখাশোনা বাদ দিয়ে দিতে হবে এমন নয়। নিদেনপক্ষে একটু কমাতে পারো। সে সিদ্ধান্ত নেয়াটা হয়তো তোমার জন্য একটু কঠিনই হবে। প্রতিদিনই অন্তত তিন ঘণ্টা যেন তোমার খেলার জন্য সময় থাকে। যাই হোক, ব্যায়াম বা অনুশীলন তোমার শক্তি বাড়াবে, তোমার মনকে প্রফুল্ল করবে আর চাপ কমাবে। হাঁটা, সাইকেল চালানো, ফুটবল খেলা, নাচা এগুলাও চাপ কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকরী অনুশীলন।

৭। মানসিক চাপে বিহ্বল হয়ে যেওনা

পরীক্ষার হলে ঢোকার আগে ইতিবাচক আর অত্মবিশ্বাসী হও। মনে রেখো যে ব্যর্থতা মানেই জীবনের সবকিছুর শেষ নয়। তারমানে হচ্ছে, যদি তুমি একবার ব্যর্থ হও তাহলে তোমার আরেকবার পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থাকছে। প্রতিটা পরীক্ষার শেষে তোমার বাবা-মা, বন্ধু ও শিক্ষকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করো। তারপর পরবর্তী পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করো। যা আর পরিবর্তন করতে পারবে না, তা নিয়ে বসে থাকলে কি হবে?

৮। নিজেকেই একটা ট্রিট দাও না!

যখনি পরীক্ষা শেষ হবে, একটা ট্রিট দিয়ে সেটা উদযাপন করো। এটা তোমার পরিশ্রমের পুরস্কার হিসেবে ভাবতে পারো। ক্রিম অ্যান্ড ফাজ, ক্লাব জেলাটো বা মুভ এন পিক এর মতো আইসক্রিম পার্লারগুলো ছোটোখাটো ট্রিটের জন্য উৎকৃষ্ট জায়গা। মাসের শেষে কিংবা সব পরীক্ষার শেষে নিজেকে বড় করে একটা ট্রিট দিতেই পারো।

স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের জন্য আমাদের মায়া আপার কাছে প্রশ্ন করো।

About the author

Maya Apa Expert Team