মনোসামাজিক মানসিক স্বাস্থ্য হতাশা

মন খারাপ ও বিষণ্ণতা

প্রত্যেকের জীবনেই উত্থান পতন থাকেই। একদিন আপনার দিন ভালো যাবে তো আরেকদিন খারাপ। কিন্তু মন খারাপের কারণে যদি আপনার প্রতিদিনের কাজ-কর্মগুলোও প্রভাবিত হয়, তাহলে সেটা বিষণ্ণতার দিকে মোড় নিচ্ছে কি না তা নিয়ে ভাববার অবকাশ আছে।

প্রিয় মানুষের মৃত্যু, সম্পর্ক সংক্রান্ত জটিলতা, অসুস্থতা, ব্যাথা কিংবা কাজের চাপের কারণে আপনার মন এমন ভার লাগতে পারে যেন আপনার কোনো সিরিয়াস অসুখ হয়েছে। বয়ঃসন্ধিকালে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে, আপনার বাচ্চা হবার পর কিংবা যখন আপনি আমসিকচক্র বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তখনও এমন অনুভূতি হতে পারে। এরকম অবস্থায় আপনার হয়তো কিছু সাহয্যের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু এটাকে ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন বলা যাবে না। কিন্তু এই সমস্যাগুলো না থাকার পরও যদি আপনি সারাক্ষণই মন খারাপ করে থাকেন, তাহলে ধারনা করতে হবে যে আপনি হয়তো বিষণ্ণতায় আক্রান্ত।

যদি এটা কেবল সাময়িক মন খারাপ হয়, তাহলে কিছু সময় পরেই তা ঠিক হয়ে যাবে। সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারা, একটু বিশ্রাম, এমনকি একটু ভালো খাবার বা বন্ধুদের সাথে আড্ডাও আপনার মন ভালো করে দিতে পারে। যদি আপনার ভালো বোধ হয়, তার মানে আপনি বিষণ্ণ নন।

মন খারাপের উপসর্গগুলো হতে পারে –

১। দুঃখবোধ

২। দুশ্চিন্তা

৩। উদ্বেগ

৪। ক্লান্তি

৫। হীনমন্যতা বোধ

৬।হতাশা

৭। রাগ

যদি এই অনুভূতিগুলো আপনার মধ্যে কাজ করে, তার মানেই এই নয় যে আপনি বিষণ্ণ।

বিষণ্ণতার উপসর্গগুলোও মন খারাপের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, কিন্তু তার গভীরতা বেশি । বিষণ্ণতার মধ্যে থাকতে পারে –

১। একটানা মন খারাপ থাকা

২। আশাহীন বা অসহায় বোধ করা

৩। হীনমন্যতা বোধ করা

৪। এখনই কেঁদে ফেলবেন এমন মনে হওয়া

৫। নিজেকে সবকিছুর জন্য দোষী মনে হওয়া

৬। অন্যদের প্রতি ধৈর্য্য রাখতে না পারা কিংবা অল্পতেই অসহ্যবোধ হওয়া

৭। কোনো কাজের জন্য তাড়নাবোধ না করা

৮। কোনোকিছুর সিদ্ধান্ত নিতে না পারা

৯। জীবনের কোনো কিছুই উপভোগ না করা

১০। আত্মহত্যা বা নিজের ক্ষতি করার চিন্তা

১১। চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন বোধ করা

সাহায্য নিন

কি কারণে আপনার মন খারাপ হয়ে আছে সেটা ব্যাপার নয়, কিন্তু যদি আপনার মন খারাপের কারণে প্রতিদিনের কাজকর্ম ক্ষতিগ্রস্থ হয় আর আপনি মানিয়ে নিতে না পারেন, তাহলে আপনার জরুরি ভিত্তিতে সাহায্য প্রয়োজন।

যদি আপনার এই মন খারাপ অবস্থা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলে, তাহলে আপনার একজন বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলা দরকার এবং সাহায্য নেয়া জরুরি।

কখন আপনাকে তৎক্ষণাৎ সাহায্য নিতে হবে?

যদি আপনি কোনো আশা খুঁজে না পান, কিংবা প্রচণ্ড অসহায় বোধ করেন আর ভাবতে থাকেন যে আপনার জীবনের কোনো মূল্য নেই, তাহলে তৎক্ষণাৎ আপনার সাহায্য প্রয়োজন। আপনার কেমন লাগছে সেটা পরিবারের কাউকে কিংবা কোনো বন্ধুকে জানান। তাদেরকে বলুন কেন আপনার এরকম মনে হচ্ছে এবং সাহায্যের জন্য কার কাছে যেতে পারেন সেটা নিয়েও কথা বলুন। অনেকেই এ ধরণের পরিস্থিতিতে কাউন্সিলর বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাবার বিষয়টা বাদ দিতে চান। কিন্তু সেটা মোটেই ঠিক নয়। তারা আপনাকে নিজের সম্পর্কে ভালোবোধ করতে উৎসাহিত করতে পারবেন এবং আপনার যা সাহায্য প্রয়োজন তা দিতে পারবেন।

যদি আগেও কখনো আপনার বিষণ্ণতার ইতিহাস থেকে থাকে, তাহলে এখন আবার তার পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা আপনার ক্ষেত্রে বেশি হবে। সেক্ষেত্রে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একজন কাউন্সিলর বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন।

যেসব সাহায্য আপনি পেতে পারেন :

  • নিজেকে নিজে সাহায্য করা

যদি আপনার বিষণ্ণতা না হয়ে থাকে, তাহলে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনার মধ্য দিয়ে আপনি এই মন খারাপের পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারেন। যেমন, আপনি যা যা করতে পারেন –

  1. রাতের ঘুমটা যেন অবশ্যই আরামদায়ক হয়, আর প্রতিদিনের ঘুমাতে যাবার সময়টা যেন ঠিক থাকে।
  2. অ্যালকোহলের পরিমাণ কমিয়ে দিন
  3. সুষম খাবার খান
  4. নিয়মিত ব্যায়াম করুন
  5. এসব অভ্যাস যেমন আপনার স্বাস্থ্য ভালো করবে, তেমনি আপনাকে প্রফুল্লও রাখবে।
  6. তাছাড়াও আরও যা করতে পারেন –
  7. যোগ ব্যায়াম ও মেডিটেশন শিখতে পারেন
  8. নিজেকে সাহায্য করার জন্য প্রেরণা দেয় এমন বইগুলো পড়ুন। তাতেও অনেকসময় ভালো কাজ দেয়।
  9. একজন কাউন্সিলরের সাথে কথা বলতে পারেন
  10. শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন

যদি আপনার বিষণ্ণতা আছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেক্ষেত্রে

বিষণ্ণতার ক্ষেত্রে চিকিৎসার বিভিন্ন উপায় আছে। আপনাকে যে সবসময় ওষুধই খেতে হবে তা নয়। বিশ্রামও অনেক সময় বিষণ্ণতার সবচেয়ে বড় নিয়ামক হতে পারে।

এমনকি কথা বলার মাধ্যমে বিষণ্ণতা দূর করারও বিভিন্ন পদ্ধতি আছে, যার কোনোটা আপনি বেছে নিতে পারেন। আপনার ডাক্তারই আপনাকে বলে দেবে কোন পদ্ধতিটা আপনার জন্য প্রয়োজনীয়।

বিষণ্ণতা দূর করার ক্ষেত্রে অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এর চারটি প্রকার আছে –

১। SSRI (selective serotonin reuptake inhibitors)- fluoxetine, paroxetine, citalopram

২। SNRI (serotonin norepinephrine reuptake inhibitors)- venlafaxine, duloxetine

৩। TCA (tricyclic antidepressants)- amitriptyline, nortriptyline, imipramine, clomipramine

৪। MAO (monoamine oxidase inhibitors)- moclobemide, phenelzine

প্রতিটা ওষুধেরই নিজস্ব কার্যকারিতা আছে। তাই, আপনার ডাক্তারই আপনাকে প্রেস্ক্রাইব করবে কোন ওষুধটা আপনার প্রয়োজন।

About the author

Maya Apa Expert Team