নারীর প্রতি সহিংসতা সংক্রান্ত কাউন্সেলিং মনোসামাজিক সম্পর্ক

আপনার উঠতি বয়সের সন্তানটি কি সুস্থ সম্পর্কে জড়াচ্ছে?

Written by Maya Expert Team

আপনার উঠতি বয়সের সন্তানটি কি সুস্থ সম্পর্কে জড়াচ্ছে?
পারষ্পরিক সম্পর্ক এমনকি উঠতি বয়সীদের সম্পর্কের ভেতরে নির্যাতন ঘটতে পারে; আর ছেলেরাও তার শিকার হতে পারে। তবে নারী ও কন্যা সন্তানদের বেলায় তা ঘটার সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি। এছাড়া একই লিঙ্গের সম্পর্কেও নির্যাতন ঘটতে পারে।


নির্যাতন ঘটলে কী কী সমস্যা হতে পারে
শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন আপনার সন্তানের দেহ ও মনে যে প্রভাব বিস্তার করে তা হয় দীর্ঘমেয়াদি। এর ফলে হতাশা, মদ ও অন্যান্য মাদকাসক্তি, খাবারে অনিয়ম ইত্যাদি হতে পারে। আর যৌন নির্যাতন থেকে গর্ভধারণ এবং যৌনবাহিত সংক্রমণের (STIs) আশংকাও থাকে।

শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে পড়ে আঘাত করা, লাথি, ঘুষি বা চড় মারা, ধাক্কা দেয়া এবং জোর করে যৌন ক্রিয়াকলাপে বাধ্য করা। আর অন্যদিকে মানসিক বা ভাষাগত নির্যাতনের বেলাতে নিচের বিষয়গুলো ঘটে:

– এমন কিছু বলা যাতে করে নিজেকে তুচ্ছ ও নির্বোধ মনে হয়।

– ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে বাধ্য করা, যার মধ্যে যৌন ক্রিয়াকলাপও থাকতে পারে।

– সঙ্গিনী কোথায়, কার সাথে আছে জানার জন্য সব সময় নজরদারি করা।

– সঙ্গিনীকে, বা তার কাছের কাউকে এমনকি তার কোন পোষা প্রাণীকে আঘাত করার হুমকি দেয়া।

সমাজকর্মী টিংক পামার নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করেন। তিনি জানান অত্যাচারের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হতে পারে। তিনি বলেন “মুঠোফোন এবং ইন্টারনেটকেও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মেয়েটি যখন তার অন্য বন্ধুদের সাথে সময় কাটাচ্ছে ছেলেবন্ধুটি হয়ত প্রতি দশ মিনিট পরপর তার মুঠোফোনে মেসেজ পাঠাতে থাকে যাতে মেয়েটি সেখানে মন দিতে না পারে এবং এভাবে ছেলেবন্ধুটি সব সময় মেয়েটিকে তার উপস্থিতি মনে করিয়ে দিতে থাকে।”


আপনি কী করতে পারেন?
সম্পর্কের বেলাতে কোন আচরণ ঠিক আর কোনটি বেঠিক তা নিয়ে আপনার সন্তানের সাথে আলাপ করুন। অনেক উঠতি বাচ্চারা ধরেই নেয় সম্পর্কে নির্যাতন ‘স্বাভাবিক ব্যাপার’ অথবা ভাবে ‘ওতো কেবল ফাজলামি করছে’। আপনার সন্তান বা তার বন্ধুদের মধ্যে এধরনের ধারণা তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়। আক্রমনাত্মক বা জবরদস্তিমূলল ব্যবহার যে স্বাভাবিক নয় এবং এধরনের ব্যবহার যে কোনো মানুষেরই মেনে নেয়া উচিত নয় সেটা তাদেরকে স্পষ্ট ভাবে বুঝিয়ে দিন।


সন্তানের ছেলেবন্ধুর যেসব আচরণ দেখে সতর্ক হবেন
নিচের সংকেতগুলোর ব্যপারে নিজে যেমন সতর্ক হবেন, আপনার সন্তানও যেন সতর্ক হতে পারে তা নিশ্চিত করুন। যদি আপনার সন্তানের ছেলেবন্ধুদের মধ্যে নিচের আচরণগুলো দেখতে পান বুঝবেন সতর্ক হবার সময় হয়েছে।

– ছেলেটি খুব হিংসা প্রবণ

– আপনার মেয়ের ফোন, ইমেইল এগুলোর উপর নিয়মিত নজরদারি করে এবং তাৎক্ষনিক সাড়া না পেলে রেগে যায়।

– আবেগের উপর নিয়ন্ত্রন নেই, বিশেষ করে রেগে গেলে হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।

– আপনার সন্তানকে তার ইচ্ছামত বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের আথে আলাপ করতে দেয় না।

– কথা কাটাকাটির সময় বলপ্রয়োগ করে।

– তার সমস্যা বা কষ্টের জন্য অন্যদের দোষারোপ করে।

– আচরণগত ভাবে অত্যাচারী।

– ওর আচরণ অন্যদের মধ্যে ভীতির উদ্রেক করে।

বন্ধুটির হিংসা এবং নজরদারিমূলক আচরণ দেখে অনেক মেয়ে মনে করে যে ভালবাসে বলে হয়ত ছেলেটি এগুলো করে। কিন্তু এটা সত্যি নয়। এই ধরনের আচরণ প্রেম বা ভালবাসার প্রকাশ নয়। আপনার সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তার ইচ্ছামত চালানোর জন্যই সে এমনটা করে। অনেক ছেলে মনে করে মেয়েবন্ধুর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করাটা বেশ পুরুষ সুলভ। আপনার সন্তানকে বুঝিয়ে দিন যে আক্রমনাত্মক আচরণ কাউকে পুরুষ করে তোলে না।

আপনার সন্তানকে আস্বস্ত করুন যে আপনি সবসময় তার পাশে আছেন
যাই ঘটুক আপনি যে আপনার সন্তানের পাশে থাকবেন সে বিষয়ে তাকে আস্বস্ত করুন। যারা নির্যাতনের শিকার হয় তারা নিজেদের নিয়ে গ্লানি বোধ করে এবং ভাবে যে নিজের ত্রুটির কারণেই সে নির্যাতনের শিকার হয়েছে (যদিও এই ভাবনা ভুল)। নির্যাতনের শিকার হওয়া যে আপনার সন্তানের ভুল নয় এবং সে যদি আপনার কাছে আসে তাহলে যে আপনি তাকে সাহায্য করবেন এটা তার কাছে পরিষ্কার করুন।


কীভাবে বুঝবেন আপনার সন্তানের ছেলেবন্ধুটি নির্যাতন করছে কি না
পামার বলেন, “উঠতি কিশোরিরা চাপা স্বভাবের হতে পারে। কিন্তু আপনি বোঝার চেষ্টা করবেন তার গোপনীয়তার কারণ কী? এটা কি আত্মনির্ভরতার লক্ষণ নাকি সে ভয় পেয়ে আপনার কাছে সত্য গোপন করছে?”

আপনার সন্তান নির্যাতিত হলে তার মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো আছে কি না মিলিয়ে দেখুন:

– সে তার বন্ধুদের সাথে আগের মত আর মিশছে না,

– স্কুলে তার ফলাফল খারাপের দিকে অথবা সে স্কুলে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছে,

– সব সময় ফোন নিয়ে ব্যস্ত আছে,

– আগের তুলনায় একা থাকতে চাইছে ও চুপচাপ হয়ে পড়েছে,

– কেমন আছে জানতে চাইলে রেগে যাচ্ছে অথবা খিটখিটে ব্যবহার করছে,

– ছেলে বা মেয়েবন্ধুর হয়ে অজুহাত তৈরি করছে

– গায়ে আচড় বা ক্ষত দেখছেন, কিন্তু তা কীভাবে হল তা জানতে পারছেন না,

– মনোভাব বা ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন, অথবা

– মদ বা অন্য মাদকদ্রব্যে আসক্তি

এর মধ্যে কিছু কিছু বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবেই দেখা যেতে পারে। কিন্তু যদি আপনার সন্তানের ব্যপারে উদ্বেগের কারণ আছে বলে ভাবেন তাহলে যা করতে পারেন:

শান্ত থাকুন: পামার বলেন “আপনার সন্তানের সাথে আলাপ করুন, কিন্তু তাকে দোষারোপ করবেন না। তাদের সাথে আলাপ শুরুর আগে তাদের উদ্বেগের কারণ ভালবাবে বুঝে নিন এবং তা নিয়ে আপনার চিকিৎসক অথবা বন্ধুর সাথে আলাপ করে নিন। এভাবে আপনি আপনার নিজের অনুভূতি ও চিন্তা সম্পর্কে আগাম ধারনা পাবেন এবং আপনার সন্তানের সাথে আলাপের সময় আপনার আবেগ ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রন করতে পারবেন”।

তাদের সাথে কখন আলাপ করবেন সেটাও ভেবে নিন: পামারের উপদেশ হচ্ছে, “তারা ঘরে ঢোকার সাথে সাথে অথবা কোন কথা কাটাকাটির মাঝামাঝি তাদের সাথে এ নিয়ে আলাপে বসবেন না। শান্ত পরিস্থিতিতে এই আলাপ শুরু করবেন, যাতে তার দেরি করে বা নেশা করে বাড়ি ফেরার বিষয়ের সাথে সেটি সম্পর্কিত হয়ে না যায়।”

কী বলবেন ভেবে নিন: বলুন যে, আপনি আলাপ করতে চান। বলুন আপনি তার ব্যপারে উদ্বিগ্ন এবং জানতে চান যে, সব ঠিকঠাক আছে কি না। এ বিষয়ে পামার বলেন, “এতে করে তার মনে হবে আপনার সাথে কথা বলা যায় এবং আপনি হয়ত তার আবেগ বুঝতে পারবেন। ঠিক তখনই আলাপ না করলেও, হয়ত সেখান থেকে চলে গিয়ে সে বিষয়টি নিয়ে ভাববে এবং পরে আপনার সাথে আলাপ করবে।”

Image Courtesy: Google Images

About the author

Maya Expert Team