রমজানে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কিছু প্রশ্নোত্তর

পবিত্র রমজান মাসে রোজা রাখার সাথে সাথে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অনেক প্রশ্নও চলে আসে, যেগুলো অনেকেই জিজ্ঞেস করে থাকেন। সেসব প্রশ্ন এবং তার উত্তর নিয়েই এই প্রবন্ধটি। এখানের উত্তরগুলো ডাক্তার, ইসলাম বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকদের সাথে কথা বলেই সাজানো হয়েছে।

ডায়াবেটিস থাকলে কি রোজা রাখা যাবে?

খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমেই হোক, আর ওষুধ খেয়েই হোক, যাদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে তাদের রোজা রাখতে কোনো অসুবিধা নেই। তারা যাতে রোজা ভাঙ্গার পর ওষুধ খেতে পারেন, সেভাবে হয়তো ডাক্তার তাদের ওষুধের সময়সূচি বদলে দেবেন। কিন্তু যাদের নিয়মিত ইনসুলিন গ্রহণের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, তারা রোজা রাখতে পারবেন না।

না খেয়ে থাকলে আমার মাইগ্রেনের ভয়াবহ ব্যথা শুরু হয়, এবং রোজা রাখলে তা আরো খারাপ অবস্থা ধারণ করে। আমার কি রোজা রাখা উচিত?

যাদের মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে তাদের রোজা রাখা উচিত নয়। তবে, সঠিক ওষুধ এবং জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। মাইগ্রেন কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে সে ব্যাপারে আপনার ডাক্তারের কাছ থেকে আরো পরামর্শ চাইতে পারেন।

যাদের রক্তচাপ অনেক বেশি বা কম, তাদের কি রোজা রাখা উচিত?

যাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে তারা রোজা রাখতে পারেন। সেক্ষেত্রে ডাক্তার হয়তো তাদের ওষুধের সময় পরিবর্তন করে দেবেন যাতে রোজা ভাঙ্গার পর তারা ওষুধ খেতে পারেন। যাদের নিম্ন রক্তচাপ আছে, কিন্তু অন্য সবদিক থেকে তারা স্বাস্থ্যবান, তারা রোজা রাখতে পারেন। কিন্তু রোজা রাখার বাইরে বাকি সময়টুকু তাদের প্রচুর পানি এবং লবণ অবশ্যই খেতে হবে।

গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা কি ক্ষতিকর? একজন গর্ভবতী মহিলার কি রোজা রাখা উচিত?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটা প্রায় প্রমাণিত যে গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা স্বাস্থ্যকর নয়। গর্ভাবস্থায় একদম প্রথম দিকে যদি কোনো গর্ভবতী নারী মনে করেন যে তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ এবং ফিট, তাহলে তিনি রোজা রাখতে পারেন। যদি তিনি মনে করেন যে পারবেন না, ইসলামে তাকে পূর্ণ অনুমতি দেয়া আছে যে তিনি রোজা না-ও রাখতে পারেন এবং বাদ যাওয়া রোজাগুলো তিনি পরবর্তীতে রাখতে পারবেন। যদি তার পক্ষে গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে তিনি পরবর্তীতে ফিদায়াহ্‌’র (ইবাদতের কোনো একটি কার্যক্রম কোনো কারণে বাদ গেলে পড়ে সেটা পূরণ করার নিয়ম) মাধ্যমে তা পূরণ করবেন।

ধূমপান ত্যাগ করার জন্য কি রমজান উপযুক্ত সময়?

অবশ্যই। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অস্বাস্থ্যকর যেকোনো অভ্যাস ছাড়ার জন্য রমজান উপযুক্ত সময়। এমনকি ধূমপান তো বটেই।

কত বছর বয়স থেকে একজন শিশু রোজা রাখতে পারে?

রোজা রাখার জন্য একজন শিশুর সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে বয়ঃসন্ধি। এতে কোনো ক্ষতি নেই। তবে তার আগে থেকেই একজন শিশু রোজা রাখবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নির্ভর করে বাবা-মা এর দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিশুর সাধারণ স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ওপর। সাত কিংবা আট বছর বয়সের আগে রোজা না রাখাই ভালো। শিশুদেরকে আগে থেকেই রোজা রাখার নিয়ম সম্পর্কে জানিয়ে রাখা ভালো এবং সে হয়তো অল্প কয়েক ঘণ্টার জন্য না খেয়ে থেকে রোজা রাখার অনুশীলনও করতে পারে।

রোজা রাখা অবস্থায় কি আমি আমার অ্যাজমা ইনহেলার ব্যবহার করতে পারবো?

এ ব্যাপারে মুসলিম বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত আছে। কেউ কেউ বলেন যে অ্যাজমা ইনহেলার-এর ব্যবহার স্বাভাবিক খাওয়া বা পান করার মতো নয়, সুতরাং রোজা রাখা অবস্থায় এটা ব্যবহার করা যেতে পারে। তাদের মতে, যাদের অ্যাজমা আছে তারা রোজা রাখতে পারবেন, এবং যখন প্রয়োজন হবে তখন ইনহেলারও ব্যবহার করতে পারবেন।

আবার অন্য একদল বলেন যে, ইনহেলারে যে সামান্য তরল পদার্থ থাকে তা ফুসফুসের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং তা রোজা ভেঙ্গে দেয়। যাদের অ্যাজমার ওপর নিয়ন্ত্রণ একেবারেই কম, তাদের নিয়ন্ত্রণ ঠিক হবার আগ পর্যন্ত রোজা না রাখাই ভালো। কেউ কেউ হয়তো দীর্ঘ সময় কাজ করবে এমন ইনহেলার ব্যবহার করে রোজা রাখতে পারেন। আরো পরামর্শের জন্য ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

রোজা রেখে কি সাঁতার কাটা যাবে?

যাবে, তবে শরীরের ভেতরে যেন পানি না যায়। এমনিতে গোসল করা বা সাঁতার কাটার সাথে রোজা রাখা না রাখার সম্পর্ক নেই। কিন্তু পানি গিলে না ফেলার ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে, যেহেতু তাতে করে রোজা ভেঙ্গে যাবে।

যদি কাউকে হাসপাতালে নিয়মিত রক্ত নিতে হয়, তিনি কি রোজা রাখতে পারবেন?

না। রক্ত নিতে হচ্ছে এমন কারো রোজা রাখার ব্যাপারে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জায়গা থেকে না-বোধক উত্তর দেয়া হয়েছে। যেদিন রক্ত নেয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না, সেদিন তারা রোজা রাখতে পারেন।

আমার নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। আমি কি রোজা রাখতে পারবো?

যদি আপনার ওষুধ খাওয়ার সময়সূচী রোজার সময়সূচির মধ্যে পড়ে, তাহলে রোজা না-ও রাখতে পারেন। যদি কোনো অসুস্থতার জন্য অল্প কয়েকদিন ওষুধ খেতে হয়, তাহলে সুস্থ হবার পর আবার রোজা রাখতে পারবেন, আর বাদ যাওয়া রোজাগুলোও পরে পূরণ করে নিতে পারবেন।

যদি আপনার ওষুধের কোর্স দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে ডাক্তারের সাথে কথা বলে ওষুধের সময়সূচী এমনভাবে পালটে নিতে পারেন যাতে রোজার সময়ের বাইরে আপনি ওষুধ খেতে পারেন।

যদি আপনার অসুস্থতা অস্থিতিশীল হয়, কিংবা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, তাহলে আপনার রোজা না রাখাই ভালো। দীর্ঘমেয়াদী ওষুধের কোর্সের কারণে যদি আপনি পরেও রোজা রাখতে না পারেন, সে ক্ষেত্রে পরে অবশ্যই ফিদায়াহ্‌ করবেন।

বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন এমন মায়েরা কি রোজা রাখতে পারবেন?

না। ইস্লামে বলা আছে যেসব মায়েরা বুকের দুধ খাওয়ান তাদের রোজা রাখার দরকার নেই। বুকের দুধ খাওয়ানো যখন বন্ধ হবে, তখন ফিদায়াহ্‌ পালনের মাধ্যমে বাদ যাওয়া রোজা পূরণ করা যাবে।

রোজা রাখা অবস্থায় কি একজন মুসলিম ব্যক্তি ওষুধ খেতে পারবেন, ইঞ্জেকশন দিতে পারবেন কিংবা প্যাচ ব্যবহার করতে পারবেন?

ট্যাবলেটজাতীয় ওষুধ গিলে খেতে গেলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। তবে, ইঞ্জেকশন, প্যাচ, কানের ড্রপ বা চোখের ড্রপ ব্যবহারে রোজা ভাঙ্গে না, যেহেতু এগুলো সরাসরি খাওয়া বা পান করার কিছু নেই। ( তবে, এই ইস্যু নিয়ে ইসলামের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ আছে)

পানিশূন্যতা কি এমন খারাপ অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে যে রোজা ভেঙ্গে ফেলতে হতে পারে?

হ্যাঁ। রোজা শুরুর আগে যদি আপনি যথেষ্ট পরিমাণ পানি পান না করেন, তাহলে আপনার প্রচণ্ড পানিশূন্যতা হতে পারে। আবহাওয়ার কারণেও পানিশূন্যতার হতে পারে, এমনকি হাঁটা বা ঘরের কাজের মতো নিত্যদিনের কাজের জন্যও।

যদি আপনার খুব সামান্য মূত্র ত্যাগ হয়, কিংবা একদমই না হয়, আপনার যদি ভারসাম্যহীন বোধ হয় এবং টাল-মাটাল অনুভব করেন, যদি আপনি অজ্ঞান হয়ে যান, তাহলে রোজা ভেঙ্গে ফেলুন এবং পানি বা পানিজাতীয় কিছু খান। ইসলাম বলে না যে আপনাকে নিজের ক্ষতি করে সারাদিনের রোজা সম্পন্ন করতে হবে। যদি রোজা ভেঙ্গে ফেলতে হয়, তাহলে পরে অন্য কোনো সময় সেই রোজা পূরণ করে নিতে হবে।

ডায়ালাইসিস হবার সময় কি আমি রোজা রাখতে পারবো?

পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস (Peritoneal Dialysis) হয় এমন রোগী রোজা রাখতে পারবেন না এবং তাকে পরবর্তীতে ফিদায়াহ্‌ পালন করতে হবে। হেমোডায়ালাইসিস (Haemodialysis) সপ্তাহে তিনদিন করা হয় এবং এর ফলে শরীরে পানি ও লবণের ব্যাপক তারতম্য হয়। এ ধরনের রোগীদেরকেও রোজা না রেখে পড়ে ফিদায়াহ্‌ পালন করতে হবে।

0 comments

Leave a Reply