মূত্রথলিতে সংক্রমণ -মধ্যবর্তী সিস্টাইটিস

ইন্টারস্টিসিয়াল(মূত্রথলির সহায়ক কোষসমূহের প্রদাহ) বা মধ্যবর্তী সিস্টাইটিস

ইন্টারিস্টিসিয়াল সিস্টাইটিসে মুত্রথলি ও তল পেটে বারবার অস্বস্তি ঘটায়। এর লক্ষণগুলো ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন হয় তবে কেউ কেউ তীব্র ব্যথা অনুভব করে থাকেন।

মুত্রথলি ভরে গেলে অথবা প্রস্রাব করার সময় তলপেটের ব্যথা বাড়তে পারে। সাধারণ সিস্টাইটিসের মতো এটিও তীব্রভাবে বারবার প্রস্রাব করার প্রয়োজন সৃষ্টি করতে পারে। তবে এই সিস্টাইটিস অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে চিকিৎসার প্রতি সাড়া দেয়না যেহেতু এটি ব্যাকটেরিয়া ঘটিত সংক্রমণ নয়। ইন্টারিস্টিসিয়াল সিস্টাইটিসের রোগীদের মধ্যে ৯০% এরও বেশি নারী। এই রোগটি প্রায়ই ৪০এর কাছাকাছি বয়সে গিয়ে ধরা পড়ে।

ইন্টারিস্টিশিয়াল সিস্টাইটিসের কারণগুলো কি কি?

কি কি কারনে মধ্যবর্তী সিস্টাইটিস হয় তা সুস্পষ্ট নয় তবে এই রোগটি বংশগত কিনা গবেষকেরা তা খুঁজে দেখছেন। এটি অন্যান্য রোগের সাথেও যুক্ত থাকতে পারে, উদাহরণস্বরূপ – ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম (IBS) ও fibromyalgia।

এই ত্বত্তও উত্থাপন করা হয় যে, ইন্টারস্টিশিয়াল সিস্টাইটিসযুক্ত ব্যক্তিদের মুত্রথলির আবরণ “ছিদ্র” হয়ে যায় ফলে প্রস্রাবে থাকা রাসায়নিক পদার্থগুলোকে মুত্রথলিতে যন্ত্রনা সৃষ্টির সুযোগ পায়।

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায়ই মূত্রাথলির ভেতরের গায়ে অল্প জায়গা জুড়ে দাগ,কাঠিন্য অথবা মুত্রথলির আবরন থেকে রক্তপাত দেখা দেয়। এই সিস্টাইটিসযুক্ত ৫%-১০% এর মতো রোগীদের মুত্রথলির যেকোন জায়গায় প্রদাহ ও নষ্ট হয়ে যাওয়া ত্বক থাকে যা আরও গুরুতর উপসর্গের পথ নির্দেশ করে।এই সমস্যাকে Hunner’s  ulcer (হানার্স আলসার)  বলে।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন করার মাধ্যমে মধ্যবর্তী সিস্টাইটিসের উপসর্গগুলোকে কমানো সম্ভব হতে পারে।

পোশাক

আঁটসাট পোশাক ও বেল্ট এড়িয়ে চলুন, বিশেষ করে যদি এগুলো আপনার কোমর বা পেটের উপর চাপ সৃষ্টি করে।

ধুমপান

ধুমপান সিস্টাইটিসের উপসর্গগুলোর অবনতি ঘটাতে পারে বলে কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ধুমপান মুত্রাশয়ের ক্যান্সারেরও একটি সম্ভাব্য কারণ তাই এটি বাঞ্ছনীয় যে আপনি একজন ধুমপায়ী হয়ে থাকলে তা ছেড়ে দিন।

মানসিক চাপ

মানসিক চাপ এই রোগের লক্ষণগুলোর আভাস দিতে অবদান রাখে। এক্ষেত্রে চাপমুক্ত থাকার বিভিন্ন কৌশল যেমনঃ গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া ও পেশীর শিথিলকরণ ইত্যাদি করার চেষ্টা করাটা সহায়ক হতে পারে।

ব্যায়াম

নিয়মিত ব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করতে পারে।

সাধারণ স্ট্রেচিং ব্যায়ামও এই রোগের উপসর্গগুলো কমাতে সাহায্য করতে পারে।

পথ্য

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ইন্টারিস্টিশিয়াল সিস্টাইটিসের জন্য উপকারী হতে পারে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণ বর্তমানে নেই, যদিও কেউ কেউ মনে করেন কিছু খাবার ও পানীয় বাদ দিলে তা উপসর্গগুলোর উন্নতি ঘটাতে পারে।

খাদ্যাভাসে যেকোন পরিবর্তন আনার পুর্বে আপনার চিকিতসকের পরামর্শ নিন যেহেতু একটি স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাটা জরুরী।

চিকিৎসা

এ ধরনের সিস্টাইটিসযুক্ত প্রতিটি ব্যক্তির জন্য কার্যকর হতে পারে এমন কোন একক চিকিৎসা নেই। যেহেতু এই রোগের লক্ষণগুলো ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে, তাই আপনার জন্য কোনধরণের চিকিৎসা কাজে দিবে তা খুঁজে বের করার জন্য আপনার বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসা পদ্ধতি চেষ্টা করার প্রয়োজন হতে পারে। কোন ধরণের চিকিৎসায় আপনার উপকার হতে পারে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করার জন্য প্রথমে আপনার চিকিৎসকের সাথে বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করাটা জরুরি।

চিকিৎসায় থাকতে পারেঃ

  • ফিজিওথেরাপি – এটি শ্রোণীর যেকোন ব্যথা যা পেশী বা চারপাশের কোষের দ্বারা সৃষ্ট তা উপশম করতে সাহায্য করতে পারে।
  • ব্যথানাশক ঔষধ – যেমন প্যারাসিটামল।
  • নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট (antidepressant) – এগুলো ব্যথা কমাতে ও অন্যান্য উপসর্গের উন্নতি করতে পারে।নির্দিষ্ট কিছু এন্টিহিস্টামিন (antihistamine) – এগুলো বারবার প্রস্রাব করার প্রয়োজনকে কমাতে পারে এবং অন্যান্য লক্ষণগুলোকে আরো ভালো করতে পারে।
  • মূত্রথলির স্ফীতি (bladder distension – মুত্রথলির আয়তন বাড়ানোর জন্য পানি দিয়ে পূর্ণ করা) – এই পদ্ধতি শুরু করার এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে উপসর্গগুলোকে সাময়িকভাবে উপশম করতে সাহায্য করতে পারে।
  • মূত্রথলির ইন্সটিলেশন (bladder instillation- এই পদ্ধতিতে মূত্রথলির আবরণের প্রদাহকে কমানোর জন্য মূত্রথলিকে ঔষধযুক্ত তরল দ্বারা পূর্ন করা হয়) – এই পদ্ধতি শুরু করার তিন থেকে চার সপ্তাহ পর উপসর্গগুলোকে সাময়িকভাবে লাঘব করতে সাহায্য করতে পারে।
  • ট্রান্সকিউট্যানিয়াস বৈদ্যুতিক স্নায়ু উদ্দীপনা (transcutaneous electrical nerve stimulation) – এক্ষেত্রে সুষুম্না কান্ড ও মস্তিষ্কে প্রেরিত ব্যথার সংকেতকে থামানো বা কমানোর জন্য মৃদু বৈদ্যুতিক কম্পন ব্যবহার করা হয়।
  • অস্ত্রোপচার – যদি অন্যান্য পদ্ধতিগুলো কাজ না করে সেক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার একটি বিকল্প হতে পারে। অবশ্য, মধ্যবর্তী সিস্টাইটিসের চিকিৎসায় অপারেশন খুব কমই ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে এই পরীক্ষাগুলো করা হয় না।

অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় অন্তর্ভূক্ত হতে পারে।

১) ইলেকট্রিসিটি বা লেজার ব্যবহার করে হানার্স আলসারের (Hunner’s Ulcer) চিকিৎসা করা (fulguration),

২) হানার্স আলসারের (Hunner’s Ulcer) অপসারন (রিসেকশন-resection),

৩) ক্ষুদ্রান্ত্রের অংশ ব্যবহার করে মুত্রথলিকে আরও বড় করা (বৃদ্ধি করা-augmentation) – সাধারণত এর সাথে মূত্রথলির ক্ষতিগ্রস্থ অংশের অপসারণ ও করা হয়।

৪) খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে, মুত্রথলির অপসারন।

খুব কম ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার করা হয় এবং এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য ঝুঁকি ও উপকারিতা নিয়ে একজন সার্জনের সাথে বিশদ আলোচনা করা উচিত।