সন্তান জন্মদানে রক্তের গ্রুপের গুরুত্ব

সন্তান জন্মদানে রক্তের গ্রুপের গুরুত্ব
যদি আপনার রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ আর আপনার সঙ্গীর রক্তের গ্রুপ হয় পজিটিভ তবে আপনার সন্তানের রক্তের গ্রুপ রেসাস পজিটিভ বা নেগেটিভ যে কোনটাই হতে পারে। যদি আপনার সন্তানের রক্তের গ্রুপ আপনার স্বামীর রক্তের গ্রুপ হয় তবে তা আপনার শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলবে।

রেসাস ডিজিজ (Rhesus disease) – এটি গর্ভের শিশুর এবং নবজাতকের হেমোলাইটিক অসুস্থতা নামেও পরিচিত। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে একজন গর্ভবতীর রক্তের অ্যান্টিবডি তার সন্তানের রক্ত কোষ ধ্বংস করে দেয়।

এটি হয় যদি-

  • মা রেসাস নেগেটিভ এবং সন্তান রেসাস পজিটিভ হয়।
  • আগেও এমন ঘটেছে অথবা রেসাস পজিটিভ সন্তানের সাথে মায়ের রক্তের গ্রুপের ট্রান্সফিউশন ঘটলে।

মায়ের শরীর রেসাস পজিটিভ রক্তের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায় শরীরে অ্যান্টিবডি (ইনফেকশন প্রতিরোধী প্রোটিন মলিকিউল) সৃষ্টির মাধ্যমে, যা এই ভিন্ন রক্তের কণাকে চিহ্নিত করে ধ্বংস করে ফেলে। একে বলে সেন্সিটাইজেশন এবং প্রথমবার যখন এটি হয় তাতে সন্তানের তেমন কোন ক্ষতি হয় না। তাই প্রথম সন্তান রেসাস পজিটিভ হলেও অল্প পরিমাণে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি হওয়াতে তার কোন সমস্যা হয় না যদি আগে সেনসিটাইজেশন না হয়ে থাকে। আগেই সেনসিটাইজেশন হয়ে থাকলে এরপর যখনই মায়ের শরীর রেসাস পজিটিভ রক্তের সংস্পর্শে আসবে তখনই তার শরীরে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি হতে থাকবে। এখন মা যদি রেসাস পজিটিভ সন্তান ধারন করেন তবে প্লাসেন্টায় গিয়ে এই অ্যান্টিবডি সন্তানের রেসাস ডিজিজ সৃষ্টি করতে পারে। সন্তান জন্ম হওয়ার পরও মায়ের শরীরের এই অ্যান্টিবডি সন্তানের শরীরে থেকে যেতে পারে এবং রক্তের লোহিত রক্তকণাকে আক্রমণ করতে পারে।

ইদানিং রেসাস ডিজিজ সাধারণত দেখা যায় না কারণ এমন অবস্থা সাধারণত প্রতিরোধ করা যায়। সন্তান জন্মদানের পূর্বে মায়েদের যে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয় তাতে রক্ত পরিক্ষার মাধ্যমে জানা যায় সন্তানের রক্তের গ্রুপ কি হবে।


লক্ষণ
রেসাস ডিজিজে শুধু সন্তানের উপর প্রভাব পড়ে মায়ের উপর নয়। সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় এই রোগ হলে সন্তানের রক্তশুন্যতা হয়। নবজাতকে যে লক্ষণগুলো দেখা যায় তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে জন্মের কয়েকদিনের মধ্যেই জন্ডিস হওয়া ও হেমোলটিক রক্তশুন্যতা হওয়া।

হেমোলাইটিক রক্তশুন্যতা হয় যখন রক্তের লোহিত রক্তকণিকা (এরা রক্তে অক্সিজেন পরিবহন করে) ধ্বংস করা হয়। এটা হয় যখন মায়ের শরীরের রেসাস নেগেটিভ রক্তের অ্যান্টিবডি প্লাসেন্টা অতিক্রম করে সন্তানের শরীরের রক্তে প্রবেশ করে। এই অ্যান্টিবডি সন্তানের রেসাস পজিটিভ রক্তে প্রবেশ করে লোহিত রক্ত কনিকাকে ধ্বংস করে। নবজাতক সন্তানে এটা যে সমস্যা করতে পারেঃ

  • শ্বাস-প্রশ্বাসের হাড় বেড়ে যাওয়া
  • পেশীর দুর্বলতা
  • খাদ্যে সমস্যা
  • জন্ডিস- জন্ডিস হয় হেমোলিটিক আনিমিয়ার কারণে। নবজাতকের জন্ডিস হলে গায়ের ত্বক এবং চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যায়। যেসব বাচ্চাদের গায়ের ত্বক ফরসা নয় তাদের জন্ডিস বোঝা যায় তাদের চোখের সাদা অংশে। শরীরের তরল অংশও হলুদ হয়ে যায়।
  • রক্তে বিলিরুবিন নামক পদার্থের মাত্রা বেশী হয়ে গেলেও জন্ডিস হতে পারে। লোহিত রক্তকনিকা ভেঙ্গে গেলে বিলিরুবিন রক্তে সাধারণভাবেই উৎপন্ন হয়। রক্ত থেকে বিলিরুবিন যকৃতে চলে যায় যাতে এটি মুত্রের সাথে শরীরের বাইরে চলে যায়। যদি শরীরে বিলিরুবিনের মাত্রা বেশী হয় বা যকৃত এই বিলিরুবিন শরীর থেকে ত্যাগ করতে পারছে না, তখন অতিরিক্ত বিলিরুবিনের জন্য জন্ডিস হয়। নবজাতকের যকৃত অতিরিক্ত বিলিরুবিন ত্যাগ করতে সক্ষম নয়, তাই ৫০% নবজাতকের জন্ডিস হয়ে থাকে।


রোগ নির্ণয়
আপনার সন্তানের জন্মের পর নাড়ি থেকে রক্ত নিয়ে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করা হয়। রক্তে লোহিত রক্ত কণিকা ধ্বংস করে এমন কোন অ্যান্টিবডি আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়। একে বলা হয় কুম্বস টেস্ট। যদি আপনার শরীরে অ্যান্টি-ডি অ্যান্টিবডি থেকে থাকে, তবে আপনার নবজাতককে জন্ডিস এবং রক্তশুন্যতা চেক করানোর পরীক্ষা করতে দেওয়া হবে।


চিকিৎসা
রেসাস ডিজিজ হালকা, মাঝারি বা ভয়ানক এরকম অবস্থার উপরে এর চিকিৎসা নির্ভর করে। রক্তের ট্রান্সফিউশন এবং ফটোথেরাপি হচ্ছে সবচেয়ে সাধারণ চিকিৎসা। ৫০% শিশুর মাত্রা থেকে মাঝারি থেকে কম যার জন্য খুব বেশী চিকিৎসা দরকার পড়ে না। খুব সকালে যখন সূর্য জোরে তাপ ছড়ায় না তখনকার রোদ এর জন্য ভাল। ২৫% শিশুর থাকে মাঝারি অসুস্থতায় ফটোথেরাপি এবং ব্লাড ট্রান্সফিউশন চিকিৎসা দেওয়া হয়। ফটোথেরাপি দেয়ার সময় আপনার সন্তানের শরীরে পানির পরিমাণ যাতে ঠিক থাকে তা খেয়াল রাখা দরকার। শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেলেই বিলিরুবিনের পরিমান বেড়ে যায়। যদি শিশু নিজে থেকে পানি পান করতে না পারে তবে শিরায় শিশু স্যালাইন দেওয়ার মাধ্যমে পানির পরিমাণ ঠিক রাখা হয়।

২৫% শিশুর থাকে ভয়ানক অসুস্থতায় ফটোথেরাপি এবং ব্লাড ট্রান্সফিউশন হচ্ছে চিকিৎসা। নবজাতকদের নবজাতক ইন্টেন্সিভ কেয়ারে রাখা হবে। ইন্টেন্সিভ ফটোথেরাপি এবং ব্লাড ট্রান্স ফিউশন হচ্ছে এর চিকিৎসা।


কি ধরনের সমস্যা হতে পারে
রেসাস ডিজিজে শরীরে প্রচুর বিলিরুবিন উতপন্ন হয়। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করলে মস্তিষ্কে বিলিরুবিন জমা হতে পারে যাকে কারনিকচার বলে। শুনতে না পাওয়া, দেখতে না পাওয়া, শেখায় সমস্যা, মস্তিষ্কের সমস্যা এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে সাথে সাথেই চিকিৎসা করে ফেলা উচিত।


প্রতিরোধ
সেন্সিটাইজেশন রোধ করা গেলে রেসাস ডিজিজ প্রতিরোধ করা সম্ভব। যদি একজন আরেইচ নেগেটিভ নারীর রক্ত আরএইচ পজেটিভ রক্তে সেন্সিটাইজড না হয়ে থাকে তবে অ্যান্টি-ডি ইমুইন্যুগ্লোবিন ইনজেকশন দিয়ে এই সেন্সিটাইজেশন প্রক্রিয়া থামানো যায়।

জন্মের পূর্বেই অ্যান্টি-ডি প্রফিলাক্সিস (আরএএডিপি) নেয়ার দুটি পদ্ধতি আছেঃ

  • এক ডোজের চিকিৎসাঃ গর্ভাবস্থার ২৮ থেকে ৩০ সপ্তাহে মায়ের কাঁধে একটি ইমুইন্যুগ্লোবিন ইনজেকশন দেয়া হয়।
  • দুই ডোজের চিকিৎসাঃ এই প্রক্রিয়ায় মায়ের কাঁধে দুটি ইনজেকশন দেয়া হয়, একটি গর্ভাবস্থার ২৮ সপ্তাহে, অন্যটি গর্ভাবস্থার ৩৪ তম সপ্তাহে।

জন্মের পর শিশুর নাড়ি থেকে রক্তের নমুনা নেওয়া হয়। যদি আপনার সন্তান আরএইচডি পজিটিভ হয় এবং আপনি সেন্সিটাইজড না হন, তবে আপনাকে অ্যান্টি-ডি ইমুইন্যুগ্লোবিন ইনজেকশন ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেওয়া হবে। এটি সন্তান জন্মের সময় আপনার রক্তের আরএইচডি পজিটিভ রক্ত কণিকা ধবংস করে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি হতে দিবে না। এতে আপনার পরের সন্তানের রেসাস ডিজিজ হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে।