কেন ভালোবাসা গুরুত্বপূর্ণ

কাউকে ভালবাসলে প্রেমপূর্ণ হৃদয় ও মুখের হাসি ছাড়াও শরীর-স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে লাভবান হওয়া যায়।

কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে এটি জানতে পারা যায় যে, একটি ভালোবাসাময় সম্পর্ক, স্পর্শ এবং শারীরিক মিলন রক্তচাপ কমানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যের আরো অনেক উপকারিতা বয়ে আনে। কোনো সম্পর্কই সুস্বাস্থ্য এবং সুখ আনয়ন নিশ্চিত করে না, কিন্তু প্রেম স্বাস্থ্যের উন্নয়নে সাহায্য করে।

শারীরিক সম্পর্ক হৃদপিন্ডের জন্য ভালো

সুস্বাস্থ্য এবং আনন্দ একই সাথে পেতে চান? যৌনমিলনসহ অন্যান্য যেকোন পদ্ধতিসমূহ, যা হৃদপিন্ডের ব্যায়াম করায় সেসব পদ্ধতি, আপনার জন্য হিতকর। যৌন আকাঙ্ক্ষা হৃদপিন্ডের গতি বাড়িয়ে দেয়, এবং অরগাজম বা প্রচন্ড উত্তেজনার সময় হৃদপিন্ডের প্রতি মুহূর্তের হৃদস্পন্দন সর্বোচ্চ সীমায় পৌছে যায়।

তবে অধিকাংশ ব্যায়ামের ক্ষেত্রে, আপনি তা কতটুকু সবলে বা উৎসাহের সাথে করবেন তার উপর নির্ভর করে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, অর্গাজমের সময় হৃদস্পন্দনের গড়মান, হালকা ব্যায়াম যেমন সিঁড়িতে উপরে উঠার সময় হৃদস্পন্দনের গড়মানের সমান হয়। অধিকাংশ ব্যক্তিকে কর্মক্ষম ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করার জন্য তা যথেষ্ট নয়।

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে, প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট (২ ঘন্টা ৩০ মিনিট) মাঝারি মাত্রার অ্যারোবিক ব্যায়াম করা উচিৎ, সে ব্যায়াম হতে পারে সাইক্লিং বা দ্রুত হাঁটা।

সপ্তাহে ১৫০ মিনিট অরগাজম হওয়ার সুযোগ বা ভাগ্য যদি না থাকে, তাহলে সাইক্লিং, দ্রুতগামী হাঁটা বা নাচের চেষ্টা করতে পারেন।

হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার অর্থ এটি দাঁড়ায় না যে, এর কারণে শারীরিক মিলন থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে, শারীরিক মিলনে হৃদপিন্ডে যে প্রভাব সৃষ্টি হয়, সেই একই প্রভাব সৃষ্টিকারী দৈনন্দিন কাজ বুকে ব্যথা সৃষ্টি (২ বার সিঁড়িতে হাঁটলে যেমন হয়ে থাকে) না করে যতটুকু সময় করা যায়, ঠিক ততটুকু সময় যৌন মিলন করা যাবে।

দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন দুশ্চিন্তামুক্ত করে

গবেষণা অনুসারে বিশেষ ব্যক্তিকে জড়িয়ে ধরার মাধ্যমে রক্তচাপ কমে যায়। একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, যেসব দম্পতি বা কপোত-কপোতী একে অপরের হাত ১০ মিনিট ধরে রাখার পাশাপাশি ২০ সেকেন্ড জড়িয়ে ধরে রেখেছেন, তারা ক্রমাগত মানসিক চাপে থাকতে হয় এমন পরিস্থিতিতে, যেমন উপস্থিত বক্তৃতার ক্ষেত্রে, ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন। স্পর্শ করা ছাড়া যেসব দম্পতি নিষ্ক্রিয় থেকেছেন, তাদের সাথে আলিঙ্গনকারীদের তুলনা করে নিম্নোক্ত ফলাফল দেখা যায়ঃ

কম মাত্রার হৃদস্পন্দন

নিম্ন রক্তচাপ মাত্রা

হৃদস্পন্দন কম হারে বৃদ্ধি পাওয়া

সুতরাং, আপনার সঙ্গীকে আলিঙ্গন করুন- তা আপনার রক্তচাপকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করতে পারে।

যৌন কর্মকাণ্ড ছাড়াও অনুরূপ ফলাফল দেখতে পাওয়া যায়, যদিও এক্ষেত্রে পুরুষ ব্যতীত শুধুমাত্র মহিলাদের ক্ষেত্রে রক্তচাপ কমতে দেখতে পাওয়া যায় ।

শারীরিক মিলন চাপ কমাতে পারে

কাজের চাপে অনেক বেশী? সকালে কাজের পিছনে ছুটে যাওয়ার কারনে মেজাজ খারাপ ও বিরক্ত? ৪৬ জন পুরুষ ও মহিলাদের উপর পরিচালিত একটি ছোট গবেষণা অনুসারে একুশ শতাব্দীর জীবনযাপন পদ্ধতির যাবতীয় চাপ ও দুশ্চিন্তা যৌনমিলন দূর করে দিতে পারে।

অন্তর্ভেদী (penetrative sex), অন্তর্ভেদী নয় (non-penetrative sex) এমন এবং হস্তমৈথুন প্রভৃতি যৌনকর্ম সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীরা ডাইরি বা খাতায় লিখে রেখেছিলেন। চাপের মুখে থাকতে হয় এমন পরীক্ষা, যেমন উপস্থিত বক্তৃতা ও উচ্চস্বরে মানসাংক করা প্রভৃতি কাজ করার সময় যেসব ব্যক্তিরা যৌনমিলন করেননি তারা সর্বোচ্চ চাপে ছিলেন। শুধুমাত্র অন্তর্ভেদী যৌনমিলন করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে রক্তচাপ সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার অর্থ দাঁড়ায় তারা চাপের সাথে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পেরেছিলেন।

অন্তর্ভেদী যৌন মিলন ছাড়া অন্তরঙ্গতা বা অরগাজম হওয়াকে অধিকাংশ ব্যক্তি দুশ্চিন্তামুক্ত বা চাপমুক্ত হতে সাহায্য করে বলে প্রমাণ পেয়েছেন। এমন অনুভব ব্যায়াম বা মেডিটেশনের সময় (ধ্যান) সময়ও পাওয়া যায়। দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে অন্তর্ভেদী যৌন মিলন করতে হবে এমন কোনো কথা নেই, আপনি যে পদ্ধতিকে উত্তম বলে মনে করেন সেটিই অনুসরণ করুন।

সাপ্তাহিক যৌন মিলন অসুস্থতা কমাতে সাহায্য করতে পারে

গবেষণাকারীদের মতে, ইমিউন সিস্টেমের (রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা) ক্ষমতা ও যৌন মিলন কতবার করা হয়- এ দুই বিষয় উভয়ের সাথে সম্পর্কিত। পেনসিলভিনিয়ায় পরিচালিত একটি গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে যে, যারা সপ্তাহে এক বা দুই বার সহবাস করে, তাদের শরীরে একটি অত্যাবশকীয় রোগ-প্রতিরোধী উপাদান উচ্চ মাত্রায় পাওয়া গেছে। যারা যৌন মিলন করেননি তাদের তুলনায় যারা করেছেন তাদের মধ্যে ইমিউনোগ্লোবোলিন এ (আইজিএ) নামক এ উপাদান ৩০% বেশি মাত্রায় দেখা গেছে। তবে, যারা সপ্তাহে দুই’য়ের অধিক বার শারীরিক মিলন করেছেন, তাদের মধ্যে এ উপাদান নিম্ন মাত্রায় দেখা গেছে।

উপরোক্ত তথ্য পড়ে এখনই যৌন মিলনের দিনক্ষণ ঠিক করতে যাবেন না। সাপ্তাহিক শারীরিক মিলন আসলেই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে কি না তা প্রমাণিত হতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

যৌন মিলনকারী নিজেদের সুস্থ মনে করেন

এটা মনে হতে পারে যে, যেসব ব্যক্তিদের নিজেকে সতেজ বা সুস্থ মনে হয়, তারা হয়তো অধিকবার যৌনমিলন করেন। কিন্তু যৌনকর্ম ও সুস্থ থাকার মানসিকতার মধ্যে সম্পর্ক থেকে থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। ৫৭-৮৫ বছর বয়সী আমেরিকানদের উপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা শারীরিকভাবে মিলিত হননি তাদের থেকে, যারা হয়েছেন তারা তাদের সাধারণ স্বাস্থ্যের মূল্যায়ন উচ্চহারে করেছেন।

তবে এর পিছনে শুধু যৌনমিলন নয়, ভালোবাসাও কাজ করে থাকে। যেসব ব্যক্তি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকেন, তারা তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ‘ভালো’ অথবা ‘খারাপ’ শব্দদ্বয়ের পরিবর্তে “খুবই ভালো” অথবা “চমৎকার” এ জাতীয় শব্দ বেশি পরিমাণে ব্যবহার করে থাকেন। এ থেকে বোঝা যায় মানসিক ও সামাজিক সমর্থন আমাদের সুস্থ থাকার মানসিকতা শতগুণে বাড়িয়ে দেয়।

ভালোবাসাময় সম্পর্ক অ্যাঞ্জিনা ও আলসারের ঝুঁকি হ্রাসকারী

একটি সুখময় বৈবাহিক সম্পর্ক অন্তত পুরুষদের ক্ষেত্রে অ্যাঞ্জিনা ও আলসারের ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে ।

১০০০০ পুরুষদের নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যেসব পুরুষ তাদের স্ত্রীদের থেকে প্রেম ও সহায়তা পান, তারা অ্যাঞ্জিনা ও আলসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে কম ছিলেন। বয়স বেড়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ থাকা প্রভৃতি ঝুঁকির পিছনেও একই কারন কাজ করছিল। অনুরূপভাবে, ৮০০০ পুরুষদের উপর পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় নিম্নোক্ত কারনে ডুয়োডেনাল আলসারে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে তারা বেশি থাকতেন বলে ব্যক্ত করেছেনঃ

পারিবারিক সমস্যা    

স্ত্রীদের কাছ থেকে ভালবাসা ও সমর্থন না পাওয়ার অনুভূতি

সহকর্মীদের মাধ্যমে আঘাত পেলে প্রতিশোধ না নেওয়া, অন্য কথায় রাগ দমন করা (গবেষণাকারীদের মতে, এটা তাদের “মানিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি”)

গবেষণাকারীরা মনে করেন যে, চাপ, সামাজিক সমর্থনের অভাব বা নিজেকে দমিয়ে বা মানিয়ে নেওয়া পুরুষদের মধ্যে আলসার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় বা আলসার আক্রান্ত  করে দেয়।

এবং যদি আপনি অবিবাহিত থাকেন…

বন্ধুদের সাথে বিকাল বা সন্ধ্যার সময়টা কাটানো স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

৭০ বছরের অধিক বয়স্ক ১৫০০ ব্যক্তিদের উপর ১০ বছর ব্যাপী পরিচালিত একটি গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে যে, যেসব ব্যক্তির বন্ধুর সংখ্যা কম ছিলো তাদের তুলনায় যাদের প্রচুর বন্ধু ছিলো তারা অধিক দিন বেঁচে ছিলেন। গবেষণাকারীদের মতে, এরকম হওয়ার পিছনে জীবনপদ্ধতি নির্বাচনে বন্ধুদের ইতিবাচক প্রভাব, যেমন ধূমপান ত্যাগ বা ব্যায়াম করা এবং মানসিক সমর্থন প্রদান প্রভৃতি কাজ করে থাকতে পারে।

অথবা অনূড়া বা অকৃতদার থাকা…

যৌনমিলনহীন জীবন উত্তম স্বাস্থ্যের মধ্যে কোনো বাধা বা অন্তরায় নয় । একটি দলের স্বাস্থ্য ও বার্ধক্যগ্রস্থ হওয়া সম্পর্কে জানতে ৭০০ জন বৃদ্ধ নানদের (মঠবাসিনী বা প্রব্রাজিকা) উপর দীর্ঘ মেয়াদে পরিচালিত হওয়া গবেষণায় দেখা গেছে ৯০ ও ১০০ বছর অতিক্রান্ত হওয়া অধিকাংশ প্রব্রাজিকা ঐ বয়সেও কর্মঠ রয়েছেন।

১৯৮৬ সালে শুরু হওয়া এ পরীক্ষার প্রথম দিকে অংশগ্রহণকারী প্রব্রাজিকাদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা পরীক্ষা করে নেয়া হয়। গবেষকরা মঠ বা গীর্জায় প্রাপ্ত তথ্য থেকে উক্ত প্রব্রাজিকাদের সামাজিক, পারিবারিক ও শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে পারেন। এসব তথ্য থেকে ঐ নানদের জীবনপদ্ধতি ও সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যাত (উদাহরণস্বরূপ উচ্চ শিক্ষা বা প্রাথমিক জীবনে ইতিবাচক মানসিকতা প্রত্যাখ্যিত হওয়ার কারন হতে পারে) হওয়ার মধ্যে যোগসূত্রতা পাওয়া যায়, তবে তা যৌন কর্মের সাথে সম্পর্কিত ছিলো না।

শারীরিক মিলনের সময়, কনডম ব্যবহার আপনাকে এবং আপনার সঙ্গীঁকে অযাচিত গর্ভবতী হওয়া এবং যৌনবাহিত সংক্রমণ (এসটিআই) থেকে নিরাপদ রাখবে।