যৌন প্রজননগত স্বাস্থ্য অধিকার

যৌন প্রজননগত স্বাস্থ্য অধিকার- বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগই যেখানে ১৪ বছরের নিচে এবং বাকী আরও ২১ শতাংশ মানুষ ১০ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে, এমন একটি দেশে যৌন প্রজননগত স্বাস্থ্য (Sexual Reproductive Health – SRH) সংক্রান্ত শিক্ষা এবং যৌন প্রজননগত স্বাস্থ্য অধিকার এর মান উন্নয়নে খুব কম কাজই করা হয়েছে। বাংলাদেশে মা, নবজাতক, শিশু স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবা থানা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়াতে বড় অগ্রগতি সাধন করেছে। তবে, এখনো মাতৃমৃত্যুর হার অনেক উচ্চ, যৌন স্বাস্থ্য ও জন্মনিয়ন্ত্রন বিষয়ে কিশোর-কিশোরীদের সচেতনতা অতি সামান্য এবং সার্বিক জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতি অনুসরনের সফলতা মাত্র ৫৮ শতাংশ (জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতি ব্যবহার থেকে ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি)।

অন্যদিকে, এদেশে নারীদের নিজেদের শরীরের উপর অধিকার নেই বললেই চলে। একজন নারী কাকে বিয়ে করবে, কার সাথে ঘুমাবে, এমনকি যখন বাচ্চা হবে তখন সে কতগুলো বাচ্চা প্রত্যাশা করে এগুলো নিয়ে তার কিছুই বলার থাকেনা। এমনকি বাসায় যখন সরকারি পরিবার পরিকল্পনা কর্মীরা বিনামূল্যে কনডম এবং জন্মনিয়ন্ত্রক বড়ি দিয়ে যায়, বেশীরভাগ স্বামী কনডম ব্যবহার করতে রাজি হন না। স্ত্রীরা প্রায় সব ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রক বড়ি খান যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ সমাধান নাও হতে পারে।

এখনো বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৩ লক্ষ অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ ঘটে যার মধ্যে ৮ লক্ষ অবৈধ ভাবে গর্ভপাত করা হয় অথবা সরকার স্বীকৃত MR করা হয়, এ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ হয় যে বর্তমানে চলতে থাকা পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে না। “মায়া আপা কি বলে” তে এখন পর্যন্ত ৬০০০ প্রশ্নের প্রায় ৬০ শতাংশ ছিল যৌন শিক্ষা, গর্ভাবস্থা এবং জন্মনিয়ন্ত্রন নিয়ে। এদের বেশিরভাগই ছিল গর্ভবস্থা নিয়ে ভীতির জিজ্ঞাসা; কোনটায় “প্রাকৃতিক পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি” কাজ করেনি, কিম্বা বাছবিচারহীন জরুরী জন্মনিয়ন্ত্রক ঔষধের (Emergency Pills) ব্যবহার অথবা ডাক্তারি পদ্ধতিতে গর্ভপাত ঘটানোর ওষুধ যেমন মিসোপ্রস্টল(misoprostol) নিয়ে মানুষ জানতে চেয়েছে। বেশীরভাগ প্রশ্ন ছিল কিশোরী এবং যুবতীদের এবং এসব প্রশ্নকারীদের মধ্যে একমাত্র মিল হচ্ছে কেউই কনডম ব্যবহার করতে আগ্রহী নন!

প্রাইমারী স্কুলে ক্লাস ১ এ ভর্তি হওয়া বাচ্চাদের মাত্র ৮০ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়া সম্পন্ন করতে পারে। গ্রামে মেয়েদের শিক্ষার হার খুবই কম। এটি প্রথমত অল্প বয়সে বিয়ের জন্য এবং দ্বিতীয়ত যৌন হয়রানীর জন্য। মাত্র ৪৫ শতাংশ মেয়ে বাংলাদেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যায় এবং খুব কম মেয়েই ক্লাসে উপস্থিত থাকে। যৌন শিক্ষা নিয়ে এমন ভুল ধারনা প্রচলিত আছে যে এটি বিবাহ পূর্ব যৌন আচরন বৃদ্ধি করে কিন্তু গবেষনায় দেখা যায় শিশু-কিশোরদের নিরাপদ যৌন আচরণ সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া হলে যৌনক্রিয়া বৃদ্ধি পায় না। কিশোর এবং কিশোরীদের উপর যৌন আক্রমণের হার ক্রমাগত বেড়ে চলেছে, অতি সাম্প্রতিককালে একটি ঘটনা ঘটেছে যেখানে একটি কিশোর ছেলেকে যৌন নির্যাতনের পর মেরে ফেলা হয়েছে, যা অবশেষে আমাদের কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। কিন্তু নিরাপদ যৌনতা নিয়ে বাচ্চাদের শেখানোর ব্যাপারে আমরা সামান্যই অগ্রসর হতে পেরেছি । তাছাড়া প্রচলিত নিষেধের কুসংস্কারগুলোকে ভেঙে ফেলার জন্যেও কাজ করা হয়েছে আরো কম, যাতে যৌন হয়রানীর শিকার শিশু-কিশোরেরা তাদের অভিভাবক অথবা বড়দের জানাতে পারে কিংবা শিক্ষক বা আইন রক্ষাকারী সদস্যদের কাছে সাহায্য চাইতে পারে।

বাল্য বিবাহর হার এখনো আগের মতই আছে। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে বিয়ের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ থেকে কমিয়ে ১৮ করার সাম্প্রতিক সরকারি সিদ্ধান্ত বাল্য বিবাহের হার আরও বাড়িয়ে দিবে। একজন ১৬ বছরের মেয়ে তার শরীর এবং তার অধিকার সম্পর্কে ১৮ বছরের মেয়ে থেকে কম জানবে। সে তার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেনা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেনা। একজন ১৬ বছরের মেয়ের শরীর বাচ্চা বহন করার মত উপযোগী নয় এবং আইনত ঐ বয়সে বিয়ে বৈধ করার মানে খুব শীঘ্রই তাকে বাচ্চা নিতে হবে। যদি তার ইচ্ছা না হয় তখন নিশ্চই তার জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং তা প্রমানের কথা আসবে। নারীর সকল মূল্য যেন কেবল মাত্র তার সন্তান জন্মদানের ক্ষমতাতেই নিহিত। যদি একজন মহিলার বাচ্চা না হয় তবে তাকে “ত্রুটিপূর্ন বস্তু” হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অল্প বয়সে বিয়ে মানে ডিভোর্সের হার বাড়ানো। বাল্য বিবাহ ফিস্টুলার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে যা যোনীর সাথে পায়ুপথ অথবা মূত্রথলীর অস্বাভাবিক যোগাযোগ এর ফলে সৃষ্টি হয়। এর ফলে সারভাইকাল ক্যান্সার সৃষ্টির সম্ভাবনাও বেড়ে যায়, এটি বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী মৃত্যুহার (২৪%) ওয়ালা ক্যান্সার। উভয়ক্ষেত্রেই, এসব নারীদের সেভাবে চিকিৎসা করা হয় না যে, তারা দূর্ভাগা এবং তাদের জরুরী চিকিৎসার সেবার প্রয়োজন। বরং, তাদেরকে একঘরে করে দেয়া হয়, স্বামীরা তাদেরকে ত্যাগ করে এবং তারা পরিত্যাক্তা ঘোষিত হয়।

এটা সত্যিই দুঃখজনক যে একটি দেশে যেখানে দুই দেশপ্রধানই মহিলা, যারা নিজেরা পালাবদল করে ক্ষমতায় আসেন, যেদেশের জাতীয় সংসদের স্পীকার একজন মহিলা এবং সংসদে বাধ্যতামূলক মহিলা প্রতিনিধিত্ব রাখা আছে, সেই দেশে মহিলাদের প্রজনন স্বাস্থ্যের মান এত খারাপ। মানসিকতা পরিবর্তন, জ্ঞানের উন্নয়ন এবং সচেতনতা বাড়াতে কাজ করা হয়ে খুব সামান্য। বাংলাদেশে মহিলাদের যৌন এবং প্রজননগত স্বাস্থ্য অধিকারের উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতি নিয়েই আজ তাই বেশি বলতে হচ্ছে।