অনকোলজি মুখের ক্যান্সার

মুখের ক্যান্সার

Written by Maya Expert Team

পরিচিতি

মুখের ক্যান্সার ওরাল ক্যান্সার হিসেবেও পরিচিত। এই জাতীয় ক্যান্সারে অস্বাভাবিক কোষ (টিউমার কোষ) জিহ্বা, মুখ, ঠোঁট বা মাড়ীতে বৃদ্ধি পায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে লালা গ্রন্থি, টনসিল ও মুখ থেকে শ্বাসনালি পর্যন্ত গলার অংশটুকুতে (ফ্যরিংক্স) এই কোষগুলো বৃদ্ধি পায়।

মুখের ক্যান্সারের লক্ষণগুলো হলোঃ

এক বা একাধিক মুখের ঘা যা নিরাময় হয় না

মুখ অথবা জিহ্বার আবরণে লাল কিংবা লাল ও সাদা রঙের দাগ

মুখের ভিতরে কোথাও ফুলে যাওয়া যা ৩ সপ্তাহ পরও কমে না

মুখের ক্যান্সারের ধরণ

প্রথমবার যে ধরণের ক্যান্সার কোষ উৎপন্ন ও বৃদ্ধি পায়, তার উপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ক্যান্সারের ধরণ নির্ণয় করে থাকেন।

স্কোয়ামাশ সেল কার্সিনোমা হলো সবচেয়ে বেশি সৃষ্ট হওয়া মুখের ক্যান্সারের  ধরণ। এই ধরণের ক্যান্সার ১০ জন ব্যক্তির মধ্যে ৯ জনের হয়ে থাকে। মুখ ও ত্বকের অভ্যন্তরীণ অংশ সহ শরীরের বিভিন্ন অংশে স্কোয়ামাশ সেল উপস্থিত থাকে।

স্কোয়ামাশ সেল কার্সিনোমা ত্বকের ক্যান্সার হওয়ার জন্যও দায়ী।

মুখের ক্যান্সারের অন্যান্য ধরণ যা সাধারণভাবে কম হতে দেখা যায় সেগুলো হলঃ

মুখের ম্যালিগন্যান্ট মেলানোমাঃ মেলানোসাইট্‌স নামক কোষে এই ক্যান্সার প্রথমে হয়। এই কোষ ত্বকের রঙ নির্ধারণে সাহায্য করে।

অ্যাডিনোকার্সিনোমাঃ লালা গ্রন্থির অভ্যন্তরে এই ধরণের ক্যান্সার উৎপন্ন হয়ে থাকে।

মুখের ক্যান্সার হওয়ার কারণ

কোষের সাধারণ জীবনচক্রে কোনো ধরণের অস্বাভাবিক পরিবর্তন মুখের ক্যান্সার হওয়ার কারণ হয়ে থাকে। এই পরিবর্তন কোষগুলোকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সৃষ্টি ও বৃদ্ধি হতে বাধ্য করে।

নিম্নোক্ত অভ্যাস ও কারণসমূহের জন্য কোনো ব্যক্তি মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেনঃ

ধূমপান ও তামাক সেবন।

পান, সুপারি খাওয়া।

মদ্যপান করা। যেসব ব্যক্তি ধূমপানের পাশাপাশি উচ্চ হারে মদ্যপান করেন, তারা সাধারন মানুষের তুলনায় মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন।

হিউমান প্যাপিলোমা ভাইরাসে (এইচপিভি) সংক্রমিত হওয়া। জরায়ুর ক্যান্সারের জন্য এই ভাইরাস দায়ী।

অত্যাধিক পরিমাণে রেড মিট (গরু, ছাগল ও ভেড়ার মাংস) এবং ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার গ্রহণ করা।

মুখের ক্যান্সারে কারা আক্রান্ত হয়?

বাংলাদেশে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ১৩%ই মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত। কেননা এখানে, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে ধুম্পান, পান খাওয়া ও তামাক সেবন খুবই সাধারণ ঘটনা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে ত্রিশোর্ধ প্রায় ৪৯,০০০০ ব্যক্তি মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত।

অধিকাংশ সময় ৬০ বছর বয়সী বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।

তবে তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্করাও মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে ধারণা করা হয় যে এই বয়সী ব্যক্তিদের মুখের ক্যান্সার হওয়ার জন্য অধিকাংশ সময় এইচপিভি সংক্রমণ দায়ী।

মহিলাদের তুলনায় পুরুষেরা মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, গড়পড়তার দিক থেকে মহিলাদের চেয়ে পুরুষেরা অধিক হারে ধূমপান করে থাকেন। ত্রিশোর্ধ পুরুষদের শতকরা ৫২ জন পুরুষই তামাক চিবানো অথবা তামাককে এক বা একাধিক পদ্ধতিতে ধূমপান করে থাকেন, যেখানে ত্রিশোর্ধ মহিলাদের মাত্র ৩.১% ধূমপান করে থাকেন, একটি বড় অংশ (ত্রিশোর্ধ মহিলাদের শতকরা ৩৯ জন) তামাকজাত দ্রব্য যেমন জর্দা, পান-সুপারির সাথে সাদা পাতা যোগ করে খেয়ে থাকেন।

মুখের ক্যান্সারের চিকিৎসা

মুখের ক্যান্সার নিরাময়ের জন্য ৩টি প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতি আছে। সেগুলো হলোঃ

সার্জারি (শল্যচিকিৎসা)- এই পদ্ধতিতে ক্যান্সার কোষগুলো এবং কিছু ক্ষেত্রে ঐ কোষগুলোর পার্শ্ববর্তী কোষগুলো সার্জারি করে অপসারণ করা হয়।

কেমোথেরাপী- এই পদ্ধতিতে ক্যান্সার কোষগুলো শক্তিশালী ঔষধ দ্বারা মেরে ফেলা হয়।

রেডিওথেরাপী- এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে উচ্চ শক্তিমাত্রার রঞ্জনরশ্মি দ্বারা ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে দেয়া হয়।

এই চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো সাধারণত সম্মিলিতভাবে প্রয়োগ করা হয়। যেমন, ক্যান্সার কোষ যাতে পরবর্তীতে জন্ম বা ফিরে আসতে না পারে তাই সার্জারির পরপর রেডিওথেরাপী ও কেমোথেরাপীর একটি কোর্স প্রদান করা হয়।

মুখের ক্যান্সারের জটিলতা

সার্জারি ও রেডিওথেরাপি উভয় চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণের পর ডিসফ্যাজিয়া (কথা বলা ও খাবার গ্রহণে সমস্যা) সৃষ্টি করতে পারে।

ডিসফ্যাজিয়া একটি সম্ভাব্য গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিতে পারে। শ্বাসনালীর মধ্যে যদি কোনো খাবার চলে যায় এবং ফুসফুসে আটকে যায়, তাহলে অ্যাসপাইরেশন নিউমোনিয়া নামক ফুসফুসের সংক্রমণের সৃষ্টি করতে পারে।

ঝুঁকি হ্রাসকরণ

মুখের ক্যান্সার থেকে নিরাপদ থাকার জন্য অথবা সফল চিকিৎসাসেবা গ্রহণের পর ক্যান্সার যাতে আর ফিরে না আসে তা প্রতিহত করার জন্য ৪টি কার্যকর পদ্ধতি আছে। সেগুলো হলোঃ

ধূমপান অথবা তামাকজাত দ্রব্য সেবন ত্যাগ করা

পান, সুপারি গ্রহণ পরিহার করা

মদ্যপানের ক্ষেত্রে পরামর্শকৃত সাপ্তাহিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। মদ্যপানের সাপ্তাহিক সীমা পুরুষদের জন্য ২১ ইউনিট এবং মহিলাদের জন্য ১৪ ইউনিট (আরো জানার জন্য মদ্যপানের ইউনিট দেখুন)।

ভূমধ্যঞ্চলীয় খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হওয়া। খাদ্য তালিকায় প্রচুর পরিমাণে তাজা শাকসবজি (বিশেষ করে টমেটো), সাইট্রাস জাতীয় ফল (যেমন কমলা, লেবু, আঙ্গুর, জাম্বুরা), অলিভ অয়েল ও মাছ যোগ করুন (আরো জানতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ দেখুন)।

সেই সাথে নিয়মিত দাঁতের চেক-আপ করানোও জরুরী কেননা দাঁতের ডাক্তারেরা মুখের ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে থাকাকালে তা প্রায়ই শনাক্ত করতে পারেন।

ফলাফল

যদি মুখের ক্যান্সার প্রথম পর্যায়ে ধরা পড়ে, তবে সার্জারি, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির সমন্বিত প্রয়োগে ক্যান্সার সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করা যায়।

মুখের ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে আছেন এমন আনুমানিক ৫ জন ব্যক্তির মধ্যে ৪ জন ব্যক্তি রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা গ্রহণের পর অন্তত ৫ বছর পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারেন এবং অনেক ব্যক্তি আরো দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারেন।

যদি পরবর্তী পর্যায়ে অর্থাৎ ক্যান্সার  মুখ থেকে পার্শ্ববর্তী টিস্যু বা কোষে ছড়িয়ে পড়ার পর মুখের ক্যান্সার নির্ণয় করা হয়, তাহলে তার ফলাফল সাধারণত খারাপ হয়। এমতাবস্থায়, ৫ জন ব্যক্তির মধ্যে শুধুমাত্র ১ জন ব্যক্তি চিকিৎসা গ্রহণের পর অন্তত ৫ বছর পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারেন।

About the author

Maya Expert Team