অনকোলজি মুখের ক্যান্সার

মুখের ক্যান্সার নির্ণয়

যদি আপনি মুখের ক্যান্সারের সম্ভাব্য লক্ষণসমূহের কোনো একটি অনুভব করে থাকেন, তাহলে আপনার ডাক্তার শারিরীক পরীক্ষা করবেন এবং প্রকাশিত লক্ষণগুলো নিয়ে কথা বলবেন।

মুখের ক্যান্সার হয়েছে এরকম সন্দেহ যদি হয়, তাহলে আরো পরীক্ষার জন্য আপনাকে একজন বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হবে। এই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার একজন অনকোলজিস্ট (ক্যান্সারের চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ) অথবা একজন নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ (ইএনটি) হতে পারেন।

বায়োপসি

ক্যান্সার কোষের উপস্থিতি পরীক্ষা করার জন্য আক্রান্ত কোষের একটি ছোট নমুনা সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে। এই নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতিকে বলা হয় বায়োপসি।

সন্দেহজনক মুখের ক্যান্সার নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বায়োপসি করানোর জন্য ৩টি প্রধান পদ্ধতি আছে। পদ্ধতিগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ

পাঞ্চ বায়োপসি

শরীরের সন্দেহজনক ক্যান্সার আক্রান্ত কোষ যদি হাতের নাগালে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে পাঞ্চ বায়োপসি করা হয়। জিহ্বা কিংবা মুখের অভ্যন্তরীণ ভাগ প্রভৃতি সহজে দৃশ্যমান জায়গায় এই জাতীয় বায়োপসি করা্রিশ্যমা

ক্যান্সার কোষ আছে এমন সন্দেহজনক অংশ অসাড় ও নিশ্চল করে দেয়ার জন্য সেখানে প্রথমে অনুভূতিনাশক (অ্যানেসথেশিয়া) প্রয়োগ করা হয়। এরপর আক্রান্ত কোষের একটি ছোট অংশ বা নমুনা কর্তব্যরত ডাক্তার কেটে নিয়ে টুইজার দিয়ে কাটা অংশ সংগ্রহ করেন।

এই প্রক্রিয়া ব্যথামুক্ত, তবে কিছুটা অস্বস্তিদায়ক মনে হতে পারে।

ফাইন নিডল অ্যাসপিরেশন সাইটোলজী (এফএনএসি)

যদি ঘাড় ফুলে যাওয়া থেকে মুখের ক্যান্সার হয়েছে এমন সন্দেহ হয়, তবে সেক্ষেত্রে বায়োপসি পদ্ধতি হবে, ফাইন নিডল অ্যাসপিরেশন সাইটোলজী (এফএনএসি)।

এ পদ্ধতিতে কর্তব্যরত ডাক্তার ফুলে যাওয়া অংশে একটি সূক্ষ্ম সূচ প্রবেশ করাবেন এবং ঐ অংশে উপস্থিত কোষ বা জলীয় পদার্থের নমুনা সূচ দ্বারা তুলে আনবেন। সংগ্রহকৃত নমুনায় ক্যান্সার আছে কী না তা পরীক্ষা করে দেখা হয়।

অনুভূতিনাশক (অ্যানেসথেশিয়া) প্রয়োগ করা হয় বলে এই পদ্ধতিটি ব্যথামুক্ত, তবে কিছুটা অস্বস্তিদায়ক মনে হতে পারে এবং প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ার পর প্রয়োগকৃত অংশে ক্ষত দেখা দিতে পারে।

প্যানেন্ডোস্কোপি

ক্যান্সার আক্রান্ত কোষ যখন গলা বা কন্ঠে কিংবা আরো ভিতরে গহ্বরের কোনো অংশে উপস্থিত আছে বলে সন্দেহ করা হয়, সেক্ষেত্রে যে বায়োপসি পরিচালনা করা হয় তাকে প্যানেন্ডোস্কোপি বলে।

এ পদ্ধতিতে ডাক্তার প্যানেন্ডোস্কোপ নামক একটি যন্ত্র ব্যবহার করে থাকেন। প্যানেন্ডোস্কোপ হলো একটি দীর্ঘ, সরু নল বা টিউব যাতে একটি ক্যামেরা ও আলোর উৎস বা লাইট সংযুক্ত থাকে। এই নলকে নাক দিয়ে ঢুকিয়ে বায়োপসি করার জন্য আক্রান্ত কোষের কিছু অংশ নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করা হয়।

ক্যান্সার মুখ থেকে গলার অন্যান্য অংশে, যেমন, স্বরযন্ত্র বা বাকযন্ত্র, অন্ননালি, শ্বাসনালী প্রভৃতিতে ছড়িয়ে পড়েছে কী না তাও প্যানেন্ডোস্কোপ দ্বারা পরীক্ষা করে দেখা যায়।

অধিকতর পরীক্ষাসমূহ

বায়োপসি পরীক্ষাতে যদি ক্যান্সারের উপস্থিতি ধরা পড়ে, তাহলে কতটুকু অগ্রসর ও শরীরের কতদূর ছড়িয়ে পড়েছে তা জানার জন্য আরো কয়েকটি পরীক্ষা করতে হয়। একে ক্যান্সারের পর্যায় নির্ধারণ বলা হয়ে থাকে।

প্রাথমিক টিউমার আক্রান্ত অংশ থেকে ক্যান্সার লসিকাতন্ত্রতে ছড়িয়ে পড়ে। রক্ত সংবহন তন্ত্রের মতো লসিকাতন্ত্র হলো অনেকগুলো পরিবাহী নালী ও গ্রন্থি দ্বারা সৃষ্ট এক ধরণের পরিবাহী তন্ত্র যা সারা শরীরে ছড়িয়ে থাকে। ইমিউন সিস্টেম বা দেহের রোগ প্রতিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরণের বিশেষায়িত কোষ এই লসিকাতন্ত্রে উৎপন্ন হয়ে থাকে।

ক্যান্সার যখন এই লসিকাতন্ত্রে পৌছে যায়, তখন তা হাড়, রক্ত ও অন্যান্য অঙ্গসহ দেহের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে মুখের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী লসিকা গ্রন্থি ছাড়া ক্যান্সার আরো দূরে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যান্সার পার্শ্ববর্তী হাড়, যেমন চোয়ালের হাড়ে এবং কিছু ক্ষেত্রে ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তাই, এই পরীক্ষাগুলোতে লসিকাগ্রন্থি, হাড়ের অবস্থা দেখা হয় এবং আরো টিউমার আছে কী না তা দেখার জন্য প্রাথমিক টিউমারের পার্শ্ববর্তী কোষগুলোকে নিরীক্ষা করা হয়।

নিম্নে এ সংক্রান্ত পরীক্ষাগুলো উল্লেখ করা হলোঃ

  • এক্স-রে পরীক্ষা
  • ম্যাগনেটিক রিজোনেন্স ইমেজিং (এমআরআই)
  • কম্পিউটারাইজড টমোগ্রাফি (সিটিস্ক্যান) স্ক্যান
  • পজিট্রন ইমিশান ট্রমোগ্রাফি (পিইটি) স্ক্যান
  • তেজস্ক্রিয় ‘ট্রেসার’ ক্যামিকেল, যা শুধু এক ধরণের বিশেষায়িত ক্যামেরাতে দেখা যায়, তা শরীরের কোনো একটি অংশে ইনজেকশন দ্বারা প্রয়োগ করা হয়। এ পদ্ধতিকে পিইটি স্ক্যান বলা হয়।

প্রয়োজন অনুসারে পার্শ্ববর্তী লসিকাগ্রন্থিগুলো থেকে আরো বায়োপসি করা হতে পারে।

পর্যায় নির্ধারণ ও শ্রেণীবিন্যাস

পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করার পর ক্যান্সার কোন ধাপ বা পর্যায়ে আছে এবং তা কোন ধরণ বা শ্রেণীর অন্তর্গত সেটা বলা সম্ভব হয়।

ক্যান্সার কতটুকু ছড়িয়ে পড়েছে তার পরিমাণ বোঝানোর পদ্ধতিকে পর্যায় নির্ধারণ বলে

শ্রেণীবিন্যাস বা বিভাগীকরণ হলো মূল্যায়ন করার একটি প্রক্রিয়া যা দ্বারা ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সার কতটুকু আক্রমণাত্মক ও ভবিষ্যতে কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে তা বোঝা যায়

  •  পর্যায় নির্ধারণ ও বিভাগীকরণ নিম্নোক্ত বিষয় নির্ধারণে সাহায্য করা থাকেঃ
  • মুখের ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায় (সহজে নিরাময়যোগ্য)
  • অন্তর্বর্তী মুখের ক্যান্সার (নিরাময় করা যেতে পারে)
  • মুখের ক্যান্সারের পরিণত পর্যায় (সহজে নিরাময়যোগ্য নয়, তবে চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার হার কমিয়ে আয়ু বাড়ানো যেতে পারে)

মুখের ক্যান্সারের ৩টি ধরণ বা শ্রেণী আছে, সেগুলো হলোঃ

  1. নিম্নশ্রেণী- এধরণের ক্যান্সার খুব ধীরে ছড়ায়
  2. মধ্যম শ্রেণী- এধরণের ক্যান্সার মৃদু গতিতে ছড়ায়
  3. উচ্চ শ্রেণী- এধরণের ক্যান্সার খুবই আক্রমণাত্মক হয় এবং চিকিৎসা গ্রহণ না করলে অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে

চিকিৎসা কি দ্রুত শুরু করতে হবে, না কী কিছু সময় অপেক্ষা করা যাবে, এ বিষয়গুলো ক্যান্সারের শ্রেণী থেকে নির্ধারণ করা যায়।

About the author

Maya Apa Expert Team