অনকোলজি মুখের ক্যান্সার

মুখের ক্যান্সারের কারণসমূহ

কোষের ডিএনএ-এর গঠন পরিবর্তনের মাধ্যমে শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টি হওয়া শুরু হয়। ডিএনএ আমাদের দেহের সেল বা কোষকে একটি সাধারণ নির্দেশাবলী প্রদান করে, যেমন কোষ কখন সৃষ্টি বা বৃদ্ধি পাবে। ডিএনএ-এর গঠনে পরিবর্তনকে মিউটেশন বলা হয়, এবং এই মিউটেশন কোষ বৃদ্ধি সংক্রান্ত নির্দেশাবলীকে পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে। অর্থাৎ যথাসময়ে থেমে যাওয়ার পরিবর্তে কোষবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। এর ফলে কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে থাকে, যার ফলশ্রুতিতে টিউমার নামক টিস্যু পিন্ড সৃষ্টি হয়।

যেভাবে মুখের ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে

দুইভাবে মুখের ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়তে পারেঃ

  • সরাসরি বা প্রত্যক্ষ ভাবে- এই প্রক্রিয়াতে ক্যান্সার মুখের বাইরের পার্শ্ববর্তী টিস্যু, যেমন পার্শ্ববর্তী ত্বক বা চোয়ালের পিছনে ছড়িয়ে পড়ে
  • লসিকা তন্ত্রের মাধ্যমে-লসিকা তন্ত্র হলো অনেকগুলো গ্রন্থির সংযুক্তে তৈরি এক ধরণের সংবহন তন্ত্র যা রক্ত সংবহন তন্ত্রের মতো সারা শরীরে ছড়িয়ে থাকে। দেহের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থার (ইমিউন সিস্টেম) জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত কোষ এই গ্রন্থিগুলো উৎপাদন করে থাকে।

যে সকল মুখের ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে তাদেরকে মেটাস্টাটিক মুখের ক্যান্সার বলে।

ঝুঁকির কারণসমূহ

মুখের ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য ঠিক কোন বিষয়টি ডিএনএ-এর গঠন পরিবর্তিত করে এবং শুধুমাত্র অল্প সংখ্যক কিছু ব্যক্তি কেন এই জাতীয় ক্যান্সারে আক্রান্ত হোন, তার সঠিক কারণ এখনো অজানা। তবে সম্ভাব্য কারণসমূহ হলোঃ

  • ধূমপান ও মদ্যপান

মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান দুইটি কারণ হলো সিগারেট অথবা অন্যান্য তামাকজাতীয় দ্রব্য, যেমন পাইপ ও সিগার গ্রহণ এবং অত্যাধিক পরিমানে মদ্যপান। উভয় ধরণের দ্রব্যই কারসিনোজেনিক, অর্থাৎ এই জাতীয় দ্রব্যে এমন ক্যামিক্যাল উপস্থিত থাকে যা কোষে অবস্থানকারী ডিএনএ-এর ক্ষতির সৃষ্টি করে এবং ক্যান্সারের জন্ম দেয়। বাংলাদেশে তামাক সেবন বা ধোঁয়াহীন তামাকজাতীয় দ্রব্য পানের সাথে মিশিয়ে গোটকা অথবা সাদাপাতা হিসেবে খাওয়া হয়। এই জাতীয় দ্রব্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ মাত্রার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের ১% এরও কম মহিলা (সব বয়সী) ধূমপান করেন, এবং প্রায় ৩৯% ত্রিশোর্ধ মহিলা পানের সাথে জর্দা অথবা সাদাপাতা খেয়ে থাকেন। তাই বাংলাদেশ মুখের ক্যান্সারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে (অন্যান্য দেশসমূহ থেকে ১৩% বেশি) শুধুমাত্র তামাক সেবনের জন্য।

উদাহরণস্বরূপ, গবেষণায় দেখা গেছে যে যদি আপনি প্রত্যহ ৪০টি সিগারেট খেয়ে থাকে কিন্তু মদ্যপান করে না থাকেন, তাহলে যে ব্যক্তি তামাক বা ধূমপান করেন না, তার থেকে মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ৫ গুণ বেশি ঝুঁকিতে আপনি থাকবেন।

যদি আপনি ধুমপান না করেন থাকেন কিন্তু সপ্তাহে গড়ে ৩০ পিন্ট মদ্যপান করে থাকেন, তাহলে একইভাবে ঝুঁকি ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।

তবে আপনি যদি প্রত্যহ ৪০টি সিগারেট গ্রহণ এবং সপ্তাহে গড়ে ৩০ পিন্টের বেশি মদ্যপান করে থাকেন, তাহলে আপনি মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ৩৮ গুণ বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন। তবে এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের অধিকাংশ মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না কেননা এখানে মহিলা সিগারেট ধুমপায়ীদের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম। এই পরিসংখ্যান নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশি পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যারা একই সময়ে যারা ধূমপান, মদ্যপান ও ধোঁয়ামুক্ত তামাক জাতীয় দ্রব্য সেবন করে থাকেন।

অনেকে মনে করেন যে ধোঁয়ামুক্ত তামাক জাতীয় দ্রব্য ক্ষতিকর নয়। এ জাতীয় দ্রব্য মুখের ক্যান্সারের পাশাপাশি অন্যান্য ধরণের ক্যান্সার, যেমন লিভার ক্যান্সার, অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার ও খাদ্যনালীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

  •  সুপারি ও পান

সুপারিতে কারসিনোজেনিক প্রভাব (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ক্ষমতা) থাকে, যা মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। এই ঝুঁকি সৃষ্টি আরো খারাপ অবস্থা ধারণ করে যখন সুপারির সাথে অনেক ব্যক্তি তামাক যোগ করে খেতে পছন্দ করে থাকেন। পান, যা চুন ও অন্যান্য মশলা মিশ্রিত করে খাওয়া হয়, তা মুখে ক্ষয়ের সৃষ্টি করতে পারে যা বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলংকায় ক্যান্সার আক্রান্তের অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়। কেননা এসব অঞ্চলে পান সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে গিয়েছে এবং রীতিনীতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পান ও এর সাথে মিশ্রিত মশলার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা খুব কমই হয়ে থাকে। এই প্রবণতায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

  •  ভাং

মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধিতে ভাং সেবনও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তামাক সেবনকারীদের চেয়ে নিয়মিত ভাং সেবনকারীরা মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন কেননা তামাকের ধোঁয়া থেকে ভাং এর ধোঁয়াতে টার বেশি পরিমাণে উপস্থিত থাকে এবং টার এর কারসিনোজেনিক প্রভাব আর বেশি।

  •  হিউমান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)

হিউমান প্যাপিলোমা ভাইরাস হলো ভাইরাসের একটি গোত্র যা ত্বক ও শরীরের আবরণকারী আর্দ্র ঝিল্লী, যেমন গলদেশ, মলদ্বার, মুখ এবং গলাতে ক্ষতির সৃষ্টি করে। ইতিমধ্যেই সংক্রমিত ব্যক্তির সাথে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তি এই ভাইরাসে সংক্রমিত হতে পারেন। পূর্ণ যৌনমিলনের পরিবর্তে শুধুমাত্র শরীরের ত্বকের সংস্পর্শের মাধ্যমেই সংক্রমণ ছড়ায়। কিছু ধরণের এইচপিভি সংক্রমণ অস্বাভাবিক টিস্যু বৃদ্ধি ও কোষে অন্যান্য পরিবর্তন ঘটায়, যা পরবর্তীতে সার্ভিক্যাল ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে।

কিছু ধরণের এইচপিভি সংক্রমণের কারণে মুখের ভিতরে অস্বাভাবিক টিস্যু বৃদ্ধি হওয়ার প্রমাণ মিলে, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুখের ক্যান্সারের কারণ হয়।

তরুণদের মধ্যে মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামুলকভাবে অনেক কম , তারপর ও যেসব তরুণদের মুখের ক্যান্সার হয়ে থাকে, তার অন্যতম কারন এইচপিভি সংক্রমণ ।

  •  খাদ্য গ্রহণ

গবেষণায় দেখা গেছে যে অত্যাধিক পরিমাণে লাল মাংস (গরু বা খাসীর মাংস), প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ভাজাপোড়া খাবার গ্রহণ মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

  • মুখের স্বাস্থ্যবিধির অপ্রতুলতা

দাঁতের ক্ষয়, মাড়ীর রোগ, দাঁত নিয়মিত ব্রাশ না করা এবং আলগা দাঁত লাগানো (নকল দাঁত) প্রভৃতি ক্ষেত্রে মুখের স্বাস্থ্য রক্ষায় মনোযোগের অভাব মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

About the author

Maya Expert Team