অনকোলজি মুখের ক্যান্সার

মুখের ক্যান্সার নিয়ে জীবন যাপন

মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার মানে এই নয় যে আপনাকে কাজকর্ম ছেড়ে দিতে হবে। তবে আপনাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিশ্রাম বা ছুটি নিতে হতে পারে এবং চিকিৎসা গ্রহণের পূর্বে যেভাবে কাজ করতেন সেভাবে হয়তো কাজ করতে পারবেন না।

এই বিষয়ে আপনার কর্মক্ষেত্রের পরিচালক অথবা উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করুন। তারা আপনার সাহায্যার্তে ‘যুক্তিসঙ্গত সমন্বয়’-এর ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। উদাহরণস্বরূপঃ

  • চিকিৎসা গ্রহণ ও ডাক্তার দেখানোর জন্য ছুটি মঞ্জুর করা
  • কাজের সময়ের ক্ষেত্রে নমনীয় হওয়া, অর্থাৎ আপনার বর্তিত দায়িত্বের পরিমাণ কমানো কিংবা কাজ করার জন্য আপনার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা
  • এখানে ‘যুক্তিসঙ্গতা’ ঐ সময়ের অবস্থার উপর নির্ভর করবে, যেমন এই ‘যুক্তিসঙ্গত সমন্বয়’ আপনার নিয়োগকর্তার ব্যবসা বা কাজে কতটুকু প্রভাব ফেলবে।
  • চিকিৎসা গ্রহণ ও অন্যান্য কাজে আপনার ঠিক কতদিন এবং কখন ছুটির প্রয়োজন হবে, সে সম্পর্কে আপনার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে যতটা সম্ভব তথ্য প্রদান উভয় পক্ষকে সাহায্য করবে। আপনার কর্মক্ষেত্রে মানব সম্পদ বিভাগ (হিউমান রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট) থাকলে সেখানে যোগাযোগ করুন। কর্মীদের ইউনিয়ন অথবা কর্মী সমিতির প্রতিনিধিও আপনাকে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতে পারবেন।

অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক

আপনি, আপনার পরিবার বা বন্ধু কারো পক্ষেই ক্যান্সার নিয়ে কথা বলা সহজ হবে না। আপনি হয়তো অনুভব করতে পারেন যে কেউ কেউ আপনাকে এড়িয়ে যাচ্ছে অথবা আপনার সাথে অপ্রস্তুত বা অসুবিধাজনক মনে করছে। আপনি কী অনুভব করছেন এবং এক্ষেত্রে আপনার পরিবার ও বন্ধুরা কী করতে পারে সে সম্পর্কে সবার সাথে খোলামেলা ভাবে কথা বলুন, এতে তারা সহজ ও নিশ্চিন্ত হতে পারবে। যদি মনে করেন নিজের জন্য সময় প্রয়োজন, তাহলে সে সম্পর্কে তাদের বলতে দ্বিধা কিংবা কুণ্ঠা বোধ করবেন না।

অর্থ আর্থিক সহায়তা

ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার কারণে আপনি যদি কাজে যাওয়া ছেড়ে দেন কিংবা খন্ডকালীন কাজ করে থাকেন, তাহলে আর্থিক ক্ষেত্রে সবকিছু মানিয়ে নেয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদি আপনি ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে থাকেন অথবা ক্যান্সার আক্রান্ত কাউকে সেবা বা যত্ন আত্তি করে থাকেন, তাহলে আর্থিক সহায়তার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করতে পারেনঃ

যদি আপনি কোনো কাজে যুক্ত থাকেন কিন্তু অসুস্থতার কারণে কাজে যোগ দিতেপারছেন না, তাহলে নিয়োগদাতার কাছে সবেতনে ছুটির আবেদন করতে পারেন। তবে আপনি কত বছর ধরে প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন এবং চাকরিতে নিয়োগের সময় চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা করার জন্য সম্মত হয়েছিলেন কী না, এসব বিষয়ের উপর আবেদন মঞ্জুর হওয়া নির্ভর করে।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বীমা এখনো পুরোপুরি প্রচলিত হয়নি। কিন্তু আপনি যদি কোনো স্বাস্থ্য বীমা পলিসি গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে তা দ্বারা চিকিৎসার পুরোপুরি বা অধিকাংশ খরচ মেটানো যাবে।

পরিবার বা বন্ধু-বান্ধবের কাছে সহায়তা চাইতে পারেন।

বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল আছে যারা কম খরচে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করে থাকেন। ক্যান্সারের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল হতে পারে এবং চিকিৎসা গ্রহণের পূর্বে পরিকল্পনা করে নেয়া ভালো কেননা চিকিৎসা গ্রহণ দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। প্রধান প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে এবং বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে জাতীয় হাসপাতাল কিংবা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা সেবা গ্রহণের চিন্তা কার্যকরী হতে পারে। দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকা ও ঔষধ ক্রয়ের জন্য আপনাকে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে ।

কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি গ্রহণ ব্যয়বহুল হতে পারে। মনে রাখবেন যে আপনার যা সঞ্চয় আছে তা আরো অনেক বছরের জন্য বজায় রাখতে হবে এবং প্রথম ৬ মাসের মধ্যে আপনার সব সম্পদ নিঃশেষ করে ফেলা ঠিক হবে না। চিকিৎসা গ্রহণের সময় এই ভুলটি অধিকাংশ ব্যক্তিই করে থাকেন। মহাখালীতে অবস্থিত ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটাল (এনআইসিআরএইচ), মিরপুরের ডেলটা হাসপাতাল ও আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান অনেক সাশ্রয়ী মূল্যের চিকিৎসা সেবা প্রদান করে যার গুণমান বিদেশে প্রদত্ত চিকিৎসা সেবার সমকক্ষ অথবা তার চেয়েও আরও ভালো হয়ে থাকে। এছাড়া কয়েকটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল আছে যারা প্রধানত নাক, কান ও গলার সমস্যার চিকিৎসা করে থাকে। অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে সেরা চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী এরকম হাসপাতাল হচ্ছে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ইএনটি (জাতীয় নাক, কান, গলা ইন্সটিটিউট), যার  ওয়েবসাইটঃ http://benth.com.bd/ এবং ইএনটি অ্যান্ড হেড নেক ক্যান্সার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, ওয়েবসাইটঃ  http://www.entbd.org/

আপনার জন্য কোন সহায়তা প্রাপ্তি সহজ ও সম্ভব হবে তা যত দ্রুত সম্ভব খুঁজে বের করুন।

অন্যদের সাথে কথা বলুন

কোনো প্রশ্ন থাকলে, আপনার ডাক্তার নিশ্চিত ভাবে তার উত্তর দিতে পারবেন। একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পরামর্শদাতা (কাউন্সেলর) বা সাইকোলোজিস্টের সাথে কথা বলা আপনার উপকারে আসবে। মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত অন্য ব্যক্তিদের সাথে কথা বলার মাধ্যমেও অনেকে উপকৃত হয়। তবে এই সহায়তা বাংলাদেশে পাওয়া কঠিন হতে পারে, কেননা এখানে এই জাতীয় গ্রুপ নেই। পরিবার ও বন্ধুদের সাথে কথা বলেও আপনি মানসিক ভাবে অনেক সহায়তা পাবেন।

মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তির সেবা

সেবা করা সহজ কোনো কাজ নয়। আপনি অন্যের প্রয়োজন পূরণে ব্যস্ত থাকলে তা আপনার মানসিক ও শারীরিক শক্তি নিঃশেষ করে দিতে পারে এবং একই সাথে আপনার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যেও হুমকির মুখে পড়বে। যত্নকারী ব্যক্তিদের উপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই কাজে যুক্ত থাকার দরুণ অধিকাংশ ব্যক্তি স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভোগে থাকেন। যদি আপনি এমন কাউকে নিয়মিত সেবা করে থাকেন, এবং তার সাথে নিজের স্বাভাবিক কাজকর্ম এবং পরিবারের দেখাশোনার দায়িত্ব পালনের সাথে সমন্ব্য় করে থাকেন, তাহলে তা আপনার উপর আরো চাপ সৃষ্টি করবে।

আপনি যদি রোগাক্রান্ত কাউকে যত্ন-আত্তি করে থাকেন, তাহলে একই সাথে আপনার স্বাস্থ্যের দিকেও খেয়াল রাখা জরুরী এবং যতটুকু সম্ভব অন্যের সাহায্য নিন। এটা আপনার এবং আপনি যাদের তত্ত্বাবধান করছেন, উভয় পক্ষের স্বার্থের জন্য প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যের দিকে যত্নবান হওয়া

নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করুন। যদি প্রত্যেক বেলা খাবার খাওয়ার জন্য বসার সময় না থাকে, তাহলে প্রত্যহ অন্তত এক বেলা খাওয়ার জন্য বসার সময় বের করার চেষ্টা করুন। ফাস্ট ফুডের উপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্যকর খাবার, যেমন ফলমূল খান।

মানসিক স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা

অবসাদ, একাকীত্বের পাশাপাশি যেসব ব্যক্তিদের আপনি দেখাশোনা করেন তাদের জন্য দুশ্চিন্তা হতে পারে। এমন সময় আসতে পারে যখন আপনি বিরক্তবোধ করতে পারেন আবার পরবর্তীতে এমন অনুভব করার জন্য অপরাধবোধ হতে পারে। এমন অনুভব করা স্বাভাবিক।

About the author

Maya Apa Expert Team