ক্যান্সার-রোধী শরীর

ক্যান্সার শুধু আমাদের পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস এবং মন দ্বারাই প্রভাবিত হয়না, আমাদের শরীরও ক্যান্সার প্রতিরোধে ও পুনরাবৃত্তি রোধে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করে। ক্যান্সার থেকে আরোগ্য লাভ করেছেন এবং ক্যান্সারের পুনরাবৃত্তি হয়েছে এমন মানুষদের মধ্যে যারা ব্যায়াম করে এবং যারা করেনা তাদের মধ্যকার পার্থ্যক্য নির্ণয়ের জন্য গবেষেনা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ব্যায়াম করে এবং শরীরের যত্ন নেয় এমন কিছু রোগী ডাক্তারদের সামান্য আশা সত্বেও দীর্ঘদিন বেচে আছে। যেভাবে এই ব্যাক্তিরা তাদের শরীরের যত্ন নিয়েছেন সেটা অবশ্যই তাদের আরোগ্য লাভে ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

ক্যান্সারের সকল স্তরে আপনার শরীরের যত্ন নেওয়ার গুরুত্ব আমরা এখন আলোচনা করবো।

ম্যাসাজ থেরাপী

স্পর্শ করা একটি পুরোনো চিকিৎসা পদ্ধতি। মায়ের স্পর্শ সন্তানকে দারুনভাবে প্রভাবিত করে, কারণ মা তার স্পর্শের মধ্যে দিয়ে কি বলছেন তা ‘জীবন্ত’। স্পর্শের মধ্য দিয়ে কিছু একটা বার্তা যায়, যা আমাদের ভেতরের বেচে থাকার ইচ্ছাকে শক্তিশালী করে।

সম্প্রতি কিছু শিশু ইদুর, যাদেরকে জন্মের পরেই তাদের মায়েদের কাছ থেকে আলাদা করা হয়েছে, তাদের উপর পরিচালিত এক গবেষনায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে মায়ের স্পর্শের অভাবে তাদের দেহ কোষগুলো আক্ষরিক অর্থেই বিভাজনে এবং বৃদ্ধিতে অস্বীকৃ্তি জানায়। প্রতিটি কোষে, জীনোমের অংশবিশেষ যা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম উৎপাদনের জন্য দায়ী তা আর দেখা যায় না। এর ফলে সমগ্র জৈবিক প্রক্রিয়া স্হবির হয়ে যায়। কিন্তু যখন চিকিৎসকেরা যেভাবে একটি মা ইদুর তার শিশু ইদুরের কান্নায় সাড়া দেয় তা নকল করে একটি শিশু ইদুরের পেছনের দিকে একটি ভেজা ব্রাশ দিয়ে চেপে দেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে এনজাইমের উৎপাদন ঘটায় এবং এর সাথে বৃ্দ্ধিও। এই গবেষনা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, আন্তরিক শারীরিক যোগাযোগ, যেমন ম্যাসাজ, খুব সম্ভবত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভেতরের জীবনীশক্তিকে উদ্দীপ্ত করে, শুধুমাত্র মানসিকভাবেই নয়, জৈবিকভাবেও। ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত আরও অধিক গবেষনায় দেখা গেছে যে, ম্যাসাজের তিন সপ্তাহের ৩০ মিনিটের সেশন মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের উৎপাদনকে ধীর করে দেয় এবং স্তন ক্যান্সারাক্রান্ত মহিলাদের শরীরে NK (ন্যাচারাল কিলার/ প্রাকৃ্তিক ঘাতক) কোষের হার বাড়িয়ে দেয়। প্রথম সেশন শেষ হওয়া মাত্রই এইসব মহিলারা আরও বেশি প্রশান্তি লাভ করেন এবং শরীরের ব্যাথা কম অনুভব করেন।

ব্যায়াম

চিকিৎসার আগে ও পরে আমাদের শরীরকে শক্তিশালী রাখার জন্য ম্যাসাজ থেরাপীর পাশাপাশি আরও একটি উপায় হচ্ছে ব্যায়াম। ব্যায়াম আমাদের শরীরবৃত্তিকে বিভিন্নভাবে উন্নত করেঃ

১. এটি চর্বির পরিমান কমায়, যা মানুষের শরীরে ক্যান্সারজনীত বিষের প্রধান            সংরক্ষণাগার।

২.  ব্যায়াম আমাদের হরমোনের ভারসাম্যকে পরিমিত রাখে। এটি অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেনের পরিমান কমায় যা ক্যান্সারের বৃদ্ধিকে উদ্দীপ্ত করে (নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সার-স্তন,গর্ভাশয় ও জরায়ু)।

৩.  ব্যায়াম রক্তে শর্করার মাত্রাকেও কমায় যার ফলে, ইনসুলিনের নিঃসরণ এবং কোষ বৃ্দ্ধির কারন সমূহ নিয়ন্ত্রনে থাকে, যা কোষের প্রদাহ এবং টিউমারের বৃদ্ধি ও বিস্তারে খুবই নাটকীয় ভূমিকা রাখে।

৪.  এমনকি ব্যায়াম প্রদাহের জন্য দায়ী সাইটোকিনের উপর সরাসরি ভূমিকা রাখে, রক্তে এদের মাত্রা কমানোর মাধ্যমে।

৫.  শারীরিক ক্রিয়াকলাপ, যেমন ধ্যান, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে, মানসিক চাপ থেকে রক্ষা করে।

সাবধানতাঃ নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম বিপদজনক হতে পারে।

কিছু কিছু ক্যান্সার শরীরের কিছু অঙ্গের ক্রীয়াকলাপকে প্রভাবিত করতে পারে, যার কারনে নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম বিপদজনক হতে পারে, যেমন বগলে অপারেশনের পর হাতের নড়াচড়া এবং যাদের হাড়ের প্রারম্ভিক অংশের পাশে মাধ্যমিক স্তরের ম্যালিগন্যান্ট টিউমার আছে এমন ব্যাক্তিদের জন্য জগিং করা ইত্যাদি। ব্যায়ামের ধরন নির্ধারন করার আগে রোগীদের উচিৎ অবশ্যই তাদের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া।

সাফল্যের চাবিকাঠি

খুব সাধারন কিছু বিষয় মেনে চলতে পারলে, শরীরের সাথে আপনার এই নতুন সম্পর্কের রূপান্তরকে সাবলীল করতে সাহায্য করবে।

আলতো করে, ধীরে ধীরে শুরু করুন – প্রথমবার ব্যায়ামের সময় আপনার ম্যারাথন দৌড়ানোর চেষ্টা করা উচিৎ হবে না। অল্প পরিমানে শুরু করুন এবং সেখান থেকে অভ্যাস গড়ে তুলুন।

যেকোনো সময় এবং যেকোনো স্হানে ব্যায়াম করুন – আপনাকে এর জন্য আয়োজন করার প্রয়োজন নেই, আপনি স্বাভাবিকভাবেই হেটে মুদি দোকানে বা অফিসে যেতে পারেন।

যেকোন কাজকর্ম চেষ্টা করুন – ব্যায়ামাগারে যাবার বা শক্তিশালী প্রশিক্ষণের কোনো প্রয়োজন নেই, যোগ ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন, যা শরীরকে ধীরে ধীরে উদ্দীপ্ত করে, প্রায় সবাই এর চর্চা করতে পারে।

মজা করুন – ব্যায়ামের সাথে লেগে থাকা সহজতর হবে যদি করার সময় আপনি তা উপভোগ করেন।

কোয়ান্টাম মেথড – এই পদ্ধতি শারীরিক ও মানসিক উভয়ই অবস্হা্কেই উন্নত করে বলে মনে করা হয়। এটি আপনাকে নিজেই নিজেকে সুস্হ করার শিক্ষা দেয়।

ব্যায়ামের সাথে বিনোদন –  আপনি একটি নিশ্চল সাইকেল বা দৌড়ানোর যন্ত্রকে বিনোদনে বদলে দিতে পারেন, টিভি এবং/অথবা ডিভিডি প্লেয়ার এ ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করবে।

মাত্রা নির্ধারন করুন – স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে, সপ্তাহে তিন থেকে পাঁচ ঘন্টা স্বাভাবিক গতিতে হাটালে, এর কার্যকরী প্রভাব দেখা যায়।

একটি গ্রুপে অংশ নিন – গ্রুপে ব্যায়াম করা এবং তার মধ্য দিয়ে অন্যদের সাহস ও সমর্থন, আপনার ব্যায়ামের অভ্যাস নিয়মিত করতে সাহায্য করবে। আপনি আপনার ভাবনা মায়া ভয়েস  এ শেয়ার করতে পারেন।