ক্যান্সার-রোধী খাদ্যাভ্যাস

ক্যান্সার প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো উপায় ক্যান্সার-রোধী খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা যা প্রধানত সবজি (শিম জাতীয় হলে ভাল), তার সাথে জলপাই বা সরিষা বা তিসির তেল এবং জৈব মাখন, রসূন, বিভিন্ন ঔষধি এবং মশলার সমন্বয়ে তৈরী।

যখনই আপনি খাবেন আপনার ‘ক্যান্সাররোধী’ খাবার থালায় নিচের উপাদানগুলো অবশ্যই থাকতে হবেঃ

শস্যদানা – বিভিন্ন ধরনের শস্যদানা দ্বারা তৈরী রুটি, শস্যদানার ভাত, চনা ডাল, বালগার বা গমের তৈরি একধরনের শুষ্ক ও সেদ্ধ খাবার।

সবজি, ফল ও সবজি জাতীয় প্রোটিন যেমন মসূর ডাল,মটরেরডাল,মটরশুটি,সয়াবিনের মন্ড থেকে তৈরী দই।

প্রাণিজ আমিষ – মাছ, মাংস।

চর্বি – জলপাই বা সরিষা বা তিসির তেল এবং জৈব মাখন।

ঔষধি ও মশলা-মরিচ গুড়া,হলুদ,রসূন।

‘ক্যান্সাররোধী’ খাবার থালায় উপরের উপাদানগুলো ছাড়াও আরও কিছু উপাদানের জন্য সুপারিশ করা হয়, যা ক্যান্সার প্রতিরোধে এবং ক্যান্সারের সাথে লড়াই করতে সাহায্য করে।

হলুদ ও মশলা দিয়ে রান্না করা তরকারি- আপনার দাদীর হাতের হলুদ দেওয়া দুধের কথা মনে আছে যাকে সব রোগের ওষুধ বলে মনে করা হত? আজকের দিনে হলুদকে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক প্রদাহরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি ক্যান্সার কোষের মৃত্যুকে উদ্দীপ্ত করে এবং তারপর ক্যান্সার কোষের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত নালীর বৃ্দ্ধিতে বাধা দিয়ে ক্যান্সার কোষের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। আরও জ়ানা গেছে যে এটি কেমোথেরাপির কার্যকারিতা বাড়ায় এবং টিউমারের বৃদ্ধি কমায়। উল্লেখ্যঃ শরীরে হজম হওয়ার জন্য হলুদকে অবশ্যই কালো মশলার গুড়ার (black powder) এর সাথে মেশাতে হবে (কেবল মরিচের সাথে মেশালেই হবে না )। হলুদকে, জলপাই বা সরিষা বা তিসির তেলে দ্রবীভূত করে নিলে আরো ভাল ফল পাওয়া যায়।

আদা- একটি শক্তিশালী প্রদাহরোধী ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। এটি নতুন নতুন রক্তনালী তৈরী হওয়া কমাতেও সাহায্য করে। ভেজানো আদা, কেমোথেরাপী বা রেডিওথেরাপীর জন্য যে বমিবমি ভাবের সৃষ্টি হয় তা উপশমেও সাহায্য করে।

রসূন, পেয়াজ, এবং পেয়াজের মতো একজাতীয় সন্ধি (leeks), রসূনের মতো গন্ধযুক্ত পেয়াজবিশেষ (shallots) ও পেয়াজ জাতীয় গাছ(chives)- এই গোত্রের মশলা গুলোর মধ্যে সালফার যৌগ থাকে যা নাইট্রোসাঅ্যামাইন ও এন-নাইট্রোসো যৌগের ক্যান্সারঘটিত ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। এই ক্ষতিকর যৌগগুলো অতিরিক্ত ভাজা মাংস এবং তামাক জ্বালানোর সময় তৈরী হয়। সালফার যৌগ স্তনে, মলাশয়ে এবং ফুসফুসের ভেতরে অস্বাভাবিক কোষের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে, এর পাশাপাশি লিউকেমিয়া (ব্লাড ক্যান্সার) প্রতিরোধেও কাজ করে।

ফুলকপি, বাধাকপি, ব্রকলি, (ক্রুশাকার সবজিসমূহ)– এই সবজিগুলো ক্যান্সাররোধী উপাদান বহন করে যা নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সারজনিত উপাদানকে নির্বিষকরণে সক্ষম হয়। এরা প্রাক ক্যান্সার কোষগুলোকে ম্যালিগন্যান্ট টিউমারে পরিণত হওয়া থেকে বাধা দেয়। এরা ক্যান্সার কোষের মৃত্যুকে উদ্দীপ্ত করে এবং ক্যান্সার কোষের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত নালীর বৃ্দ্ধিতে বাধা দিয়ে (Angiogenesis) ক্যান্সার কোষের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে ।

ক্যারোটেনয়েড (Carotenoids) সমৃদ্ধ সবজি ও ফল- গাজর, মিষ্টি আলু, মিষ্টি কুমড়া, টমেটো, বীট, পালং এবং উজ্জ্বল রঙের সকল সবজি ও ফল (কমলা,লাল,হলুদ,সবুজ রঙের) ভিটামিন এ ও লাইকোপেন (lycopene) বহন করে, যা ক্যান্সার গোত্রের কোষসমূহের বৃদ্ধিতে বাধা দিতে সক্ষম বলে প্রমানীত, যার কিছু কিছু বিশেষভাবে আক্রমণাত্মক (যেমন brain gliomas).

টমেটো- এটি প্রমানিত যে টমেটোর মধ্যে থাকা লাইকোপেন (lycopene) ক্যান্সার রোগীদের টিকে থাকার ক্ষমতা বাড়ায়, যারা সপ্তাহে অন্ত্যত দু’বার টমেটো সস দিয়ে খাবার খান। উল্লেখ্যঃ টমেটো এমনভাবে রান্না করা দরকার যাতে করে লাইকোপেন নির্গত হয়। জলপাই তেলে টমেটোকে মিশালে এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।

ঔষধি এবং মশলা- বিভিন্ন ঔষধি যেমন পুদিনা,রোজমেরী, থাইম, ওরেগ্যানো ও তুলসী ক্যান্সার কোষের ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করে এবং যে এনজাইমগুলো দ্বারা ক্যান্সার কোষ আশেপাশের কোষকে আক্রমন করে, সেই এনজাইমগুলোকে বাধা দিয়ে এদের গতি হ্রাস করে। Parsley ও Celery, apigenin বহন করে যা ক্যান্সার কোষের ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করে এবং ক্যান্সার কোষের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত নালীর বৃ্দ্ধিতে বাধা দিয়ে (Angiogenesis) ক্যান্সার কোষের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে।

ভিটামিন ডি- সম্প্রতি দেখা গেছে যে ভিটামিন ডি এর পর্যাপ্ত সরবরাহ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ঝুকি যথেষ্ট পরিমানে কমায়। সাধারন অবস্থায় ত্বকের কোষ ভিটামিন ডি উৎপন্ন করে, যখন তা সরাসরি সূর্যের নিচে উন্মুক্ত থাকে, তবে ভিটামিন পিলের মাধ্যমেও তা পাওয়া যায়।

লেবুজাতীয় ফল- কমলা, মানডারিন, লেবু ও জাম্বুরাতে প্রদাহরোধী ফ্ল্যাভনয়েড আছে। যকৃত (liver) যে প্রক্রিয়ায় ক্যান্সারজাতীয় উপাদানকে নির্বিষকরণ করে, এই ফ্ল্যাভনয়েড তা বাড়িয়ে দেয়। দেখা গেছে যে ট্যাঞ্জেরিন (Tangerines) এর খোসায় থাকা ফ্ল্যাভনয়েড- মস্তিষ্কের ক্যান্সার কোষকে ফুটো করে ঢুকে যায় যাতে করে আশেপাশের কোষে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বেরিসমূহ- ব্ল্যাকবেরি, স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি ও ক্র্যানবেরিতে থাকে Ellagic acid এবং অধিক পরিমানে Polyphenols. এগুলো ক্যান্সারজাতীয় পদার্থের শরীর থেকে বের হয়ে যাবার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং নতুন রক্তনালী তৈরি বন্ধ করে। Anthocyanidines এবং proanthocyanidines ও ক্যান্সার কোষের ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করে।

সবুজ চা- টিউমারের বৃদ্ধি ও ছড়িয়ে পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় নতুন রক্তনালী তৈরির প্রক্রিয়াকে দমন করে। খুঁজে দেখুন সবুজ চা কিভাবে কাজ করে এবং অন্যান্য সুবিধাসমূহ।

Dark চকোলেট- Dark চকোলেটে (৭০% এর চেয়ে বেশি কোকো) প্রচুর অ্যান্টিকঅক্সিডেন্ট, proanthocyanidines এবং অনেক পলিফেনল থাকে। এই অনুগুলো ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিকে মন্হর করে এবং নতুন রক্তনালী তৈরির প্রক্রিয়াকে দমন করে। উল্লেখ্যঃ দুধ থেকে তৈরী খাবারের সাথে চকোলেট মেশালে কোকো অনুর উপকারী প্রভাব নষ্ট হয়ে যায়। চকোলেট দুধকে এড়িয়ে চলুন।