স্তন্যপান করানোর স্থানের গুরুত্ব

সময় বদলাচ্ছে এবং বর্তমানে অধিকাংশ নারী সন্তান জন্ম নেওয়ার কিছুদিন পরেই বাড়ির বাইরে যাছেন। তাদের পুনরায় কাজ অথবা পড়াশোনা করতে হচ্ছে। কিন্তু সন্তান জন্ম নেওয়ার পরের জীবন বেশ কঠিন হয়। আমাদেরকে যখন দৈনন্দিন কাজ অব্যাহত রাখতে বাধ্য হতে হয়, যেমন- নিকটতম কাঁচা বাজার থেকে মুদিখানার জিনিস সংগ্রহ করতে হয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে যেতে হয় এক্ষেত্রে কোন সুযোগ সুবিধার পরিবর্তন হয়নি যার দ্বারা প্রয়োজনগুলো পূরণ করা যায়। খুব অল্প সংখ্যক অফিস, দোকান, রেস্টুরেন্ট অথবা রেল স্টেশন বা বিমানবন্দরে মা ও শিশুর জন্য নিরাপদ জায়গা রয়েছে যেখানে কিছু সময় বসে বাচ্চাকে স্তন্যপান করানো যায়।

 

এর ফলে অনেক মা তাদের সন্তানকে প্রথম ৫ মাস একচেটিয়াভাবে স্তন্যপান করানো থেকে নিরূৎসাহিত হন। একচেটিয়াভাবে স্তন্যপান করানোর অর্থ হলো আপনার সন্তানকে শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো এবং অন্যকিছু না খেতে দেওয়া; এমনকি একফোঁটা পানিও না। শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়া শিশুরা বোতলের দুধ খাওয়া শিশুদের তুলনায় স্বাস্থ্যবান হয়। তারা বিভিন্ন রোগে কম আক্রান্ত হয়, যেমন- ডায়রিয়া, কানের ইনফেকশন, বুকের ইনফেকশন (অ্যাজমা বা অ্যালার্জি জাতীয় রোগে পরবর্তী জীবনে কম আক্রান্ত হয়)। শুধুমাত্র স্তন্যপান করা শিশুদের অধিকাংশই সঠিক ওজনের অধিকারী হয় (বেশিও নয়, আবার কমও নয়), তাদের IQ অন্যদের তুলনায় উন্নত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন বিষয় হলো, মায়ের সাথে এসকল শিশুর বন্ধন শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে যে সকল শিশুকে স্তনপান করানো হয়না তারা প্রায়ই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। যদি স্তন থেকে বের করে দুধ খাওয়ানোও হয়, অনেকক্ষেত্রেই বোতল, নিপল এবং পাম্প সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত করা হয়না।

 

সত্যি বলতে বর্তমানে নারীরা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপুর্ণ অংশ, বাংলাদেশে বর্তমানে ১১.৩ মিলিয়ন নারী কর্মরত রয়েছেন (BBS,২০০৯ তথ্যানুযায়ী)। বিপুল সংখ্যক নারী RMG সেক্টরে কাজ করেছেন। আরেকটি গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নারীরা টিনএজের শেষের দিকে বা ২০ বছর বয়সের দিকেই কাজ করতে শুরু করে। এই সময়ের মধ্যে তারা বিয়ে করে ও সন্তান নেয়। সুতরাং অধিকাংশ চাকুরিজীবী নারীর সন্তান রয়েছে যাদের কাজের সময় বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে হয়। শিশুকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বুকের দুধ খাওয়াতে উৎসাহ দেওয়া হয়। অথচ আইনানুমোদিত মাতৃত্বকালীন ছুটির সময়কাল মাত্র ছয় মাস। আবার কিছু সংস্থা এমনকি বৃহৎ কর্পোরেট কোম্পানীগুলো কর্মচারীদের পুর্ণ ছয় মাস ছুটিরও অনুমতি দেয়না। সে কারনে অফিস, স্কুল এবং কলেজগুলোতে নারীদের জন্য নিরাপদ জায়গা থাকা প্রয়োজন যেখানে বসে তারা বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে পারবেন।

 

অনেক কারখানা, সরকারী অফিস এবং কিছু অলাভজনক যেমন ব্র্যাকের মত প্রতিষ্ঠানে নার্সারী রয়েছে, যেখানে প্রশিক্ষিত কর্মচারীদের দ্বারা শিশুর যত্নের ব্যবস্থা করা হয়। মায়েদের কিছু সময়ের জন্য বিরতি দেওয়া হয় এবং বাচ্চার সাথে তারা কিছু সময় কাটাতে পারেন ও খাওয়ানোর সুযোগ পান। কিছু প্রতিষ্ঠানে এরকম ব্যবস্থা আছে এবং নতুন মায়েদের দীর্ঘকালীন ছুটিরও ব্যবস্থা করা হয়।

 

তবে অধিকাংশ সংস্থা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান এমনকি নামকরা কিছু প্রতিষ্ঠানের অফিস ভবনে নার্সিং রুম বা ডে কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন দেশে সাধারনত বিমানবন্দর বা রেল স্টেশনে নার্সিং রুম রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে তা দেখা যায়না। এমনকি রাজধানীতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মায়েদের জন্য কোন ঘরের ব্যবস্থা নেই। শপিং সেন্টার গুলোতেও একই অবস্থা (এমনকি বৃহৎ শপিং মল ও মুল্যবান দ্রব্য পাওয়া যায় সেখানেও নার্সিং রুম নেই, ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের ২টি শপিং সেন্টার রয়েছে- যেখানে নার্সিং রুমের কোন ব্যবস্থা নেই)।

 

ফলাফলস্বরূপ অনেক নারী হয় স্তন্যদান বন্ধ করেন, নয়তো বাইরে যাওয়া বন্ধ করেন। যদি নারীরা বাইরে যাওয়া অথবা সন্তানকে স্তনপান করানো বন্ধ করেন, তবে সেটি খুবই নিন্দনীয়। স্তনের দুধ বের করে খাওয়ানো অথবা প্রক্রিয়াজাত দুধ কেনা অধিক খরচের কারনে সম্ভব হয়না। দেশীয় উৎপাদিত সহজে ক্রয়যোগ্য পাম্প বাজারে পাওয়া যায়না। এবং বুকের দুধ সংরক্ষণের জন্য রেফ্রিজারেটর ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রয়োজন।

 

একটি গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন হলো, কাজের পরিবেশ না থাকায় নতুন মায়েদের মত কর্মশক্তি যারা অর্থনীতির সাথে জড়িত, তাদেরকে ঘরে বসিয়ে রাখার ক্ষতি আমরা কি পূরন করতে পারবো? বিভিন্ন কোম্পানী বা সংস্থাগুলোতে খুব সহজে স্বল্প খরচে নার্সিং স্পেস তৈরী করা যায়। এমনকি কোন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা ডে কেয়ার সুবিধা না থাকার ফলে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ নারী কর্মীদের চাকুরী ছাড়ার ক্ষতির সাথে ডে কেয়ার সুবিধা দেওয়ার খরচ তুলনা করে দেখেছে? মা হওয়ার অর্থই কি গৃহবন্দী হয়ে থাকা? একজন মায়ের সন্তানকে স্তনপান করানোর বা না করানোর স্বাধীনতাকে আমরা স্বাগত জানাই। সেই সাথে একজন মায়ের বেতনভুক্ত চাকুরীতে থাকার অধিকারকে আমরা সম্মান জানাই। কারন এটা মা ও শিশু উভয়ের জন্য লাভজনক। তবে আমাদের মায়েরা যাতে কর্মশক্তির একটি গুরুত্বপুর্ণ অংশ হয়ে থাকতে পারে সে বিষয় নিশ্চিত করতে আমরা কি যথেষ্ট চেষ্টা করছি (নারীদের ৫৪.৩০% অংশ কাজ করছে)?

আমরা যখন মায়েদের শিশুকে স্তন্যপান করানোর ক্ষেত্রে উৎসাহদানে প্রচারনা চালাচ্ছি, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে শুধুমাত্র মায়েদের সন্তানের যত্নের ব্যাপারে উৎসাহ দিলে চলবেনা। সেক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।

0 comments

Leave a Reply