বর্ষায় শিশুকে সামলান

বর্ষায় শিশুকে সামলান
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বর্ষা ঋতু এখন আমাদের ঘরে। প্রায়ই বৃষ্টি হচ্ছে, কখনও মুষলধারে, কখনও বা থেমে থেমে। ঘরে যদি আপনার শিশু থাকে, তবে এ সময়টা খুব সাবধান। পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের সংক্রমণের এটাই মোক্ষম সময়। পানি দেখলে কে না খুশি হয়, কিন্তু  ওর স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্যই একটু বেশি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। শিশুদের এই সময়টায় পানি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা কিছুটা কঠিন হলেও এর বিকল্প নেই। তবে জীবাণু, ময়লা, অসুস্থতা, এসব নিয়ে দু:শ্চিন্তার কিছু নেই, সময়োচিত কিছু পদক্ষেপ নিলেই আপনার শিশুও ঠিক থাকবে, আপনিও নির্ভার-নিশ্চিন্ত থাকবেন।


কি কি সমস্যা হতে পারে
বর্ষা মৌসুম মানেই অনেক অনেক পানি। জলাবদ্ধতা আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাভাবিক একটি চিত্র এই সময়ে। আর এই বদ্ধ পানিই আবার মশা এবং পোকামাকড়ের আবাসস্থল। এখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুজাতীয় বিভিন্ন অসুখ। তাছাড়া কলেরা, আমাশয়ও এসময়কার অন্যতম অসুখ, যা ছড়ায় খাওয়ার পানির মাধ্যমে। টাইফয়েডও এই উপমহাদেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি পানিবাহিত রোগ। এটিও ছড়ায় দূষিত পানি পান ও নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার গ্রহণের কারণে। লেপটোস্পিরোসিস, ব্যাকটেরিয়াজনিত এই রোগ। এই মৌসুমেই ঠাণ্ডা, সর্দি-কাশি, জ্বরের সাথে সাথে এটি দেখা দেয়।


কীভাবে রক্ষা করবেন আপনার শিশুকে?
বছরের যেকোনো সময়েই শিশুকে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব কঠিন একটা কাজ। আর বর্ষা হলে তো কথাই নেই। যেন চারদিক থেকে অসুখগুলো ওঁৎ পেতে থাকে বাচ্চাদের ধরার জন্য। যে বাচ্চারা বৃষ্টির জমা পানি ও কাদায় মাখামাখি করে তাদের জন্য এই ঝুঁকিগুলো আরো বেশি। তবে বাবা-মা হিসেবে সামান্য কিছু টিপস মেনে চললেই এসব অনাকাঙ্খিত অসুস্থতাগুলো এড়ানো সম্ভব হয়।

টিপস:

  • গরম পানি কাজ করে যাদুর মতোন। পানিবাহিত যেকোনো রোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে এই গরম পানি। অধিকাংশ রোগের জীবাণু ধ্বংস হয়ে যায় তাপে। অনেকেই আছেন যারা ২০ মিনিট ধরে পানি ফোটান, কিন্তু জীবাণু ধ্বংস করতে আরও কম সময়েই সম্ভব।
  • আপনি যদি পানি ফোটাতে না চান, তবে পানি বিশুদ্ধকরণের জন্য ট্যাবলেট পাওয়া যায় আপনার হাতের নাগালেই, সেটিও ব্যবহার করতে পারেন।
  • এসময়ে যথাসম্ভব বাইরের খাবার এড়িয়ে চলুন। শিশুকে তো কোনমতেই কেনা খাবার দেওয়া যাবে না। কষ্ট হলেও ঘরেই খাবারের ব্যবস্থা রাখুন। এর একটা কারণ হতে পারে যে, বাইরের খাবারে যে পানি ব্যবহার হচ্ছে তা নিয়ম মেনে ফোটানো হচ্ছে কিনা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ঠিকমতো পালন হচ্ছে কিনা, এগুলো যেহেতু আমরা নিশ্চিত করতে পারবো না, তাই আমাদেরই উচিত এ সময়টাতে বাইরের খাবার এড়িয়ে চলা।
  • টাইফয়েড এমন একটি রোগ, যা কিনা শিশু-বৃদ্ধ বাছবিচার করে না। এই মৌসুমকে টাইফয়েড মৌসুমও বলা যেতে পারে। আগেই বলেছি, বাইরের খাবারে প্রচুর পরিমাণে আশংকা লুকিয়ে থাকে টাইফয়েডের। কাজেই আপ্রাণ চেষ্টা করুন বাইরের খাবার থেকে এসময় নিজেকে দূরে রাখতে, সেইসাথে আপনার শিশুকেও। একান্তই যদি খেতেই হয়, তবে নিশ্চিত করুন যে, আপনার শিশুকে একদম গরম গরম কোন খাবার পরিবেশন করা হোক। তাপে অনেক জীবাণু নষ্ট হয়ে যায়, তাই গরম খাবারের বিকল্প নেই। খাবার গরম করতে চাইলে ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় তা গরম করুন।


মশা থেকে সাবধান

  • আপনার শিশুকে ম্যালেরিয়া এবং ডেঙ্গু থেকে রক্ষা করতে চাইলে মশা থেকে তাকে দূরে রাখতে হবে অবশ্যই। আপনার ঘরের এয়ারকুলার থেকে যে পানিটা পড়ছে  সেই পাত্রটা পরিস্কার রাখার চেষ্টা করুন সবসময়। তা নাহলে সেখানেই ম্যালেরিয়া এবং ডেঙ্গুর জীবাণু বাসা বাঁধতে কার্পণ্য করবে না।
  • আপনি যে জায়গাটাতে থাকেন, সেখানে যদি মশার আধিক্য থাকে, তবে মশা থেকে রক্ষার উপায় হিসেবে এক ধরনের ক্রিম ব্যবহার করতে পারুন, অথবা মশানাশক কিছু স্প্রে করুন নিয়মিতভাবে। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধক হচ্ছে মশারি ব্যবহার করা। মশারি আলোবাতাস চলাচলেও সাহায্য করে, আবার মশা থেকেও রক্ষা করে। সন্ধ্যার সাথে সাথেই দরজা-জানালা বন্ধ করে দিলে মশা খুব কমই সুবিধা করতে পারবে।
  • বৃষ্টির পানির সংক্রমণ থেকে শিশুকে রক্ষার আরেকটি উপায় হচ্ছে গামবুট পরানো। এটি পায়ে থাকলে ময়লা পানির সংস্পর্শে আসবে না শিশুর চামড়া, নিরাপদও থাকবে। সেইসাথে শিশু তার ইচ্ছা মতোন লম্ফ-ঝম্পও করতে পারবে। ছাতা, রেইন কোটও খুবই অত্যাবশ্যকীয়। এগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে লেপটোস্পিরোসিসসহ যেকোনো ধরনের চামড়ার সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব।


নখ কামড়ানো যাবে না
আপনার শিশুর যদি নখ কামড়ানোর অভ্যাস থাকে, তবে এই মৌসুমের জন্য তা তোলা থাক। আমরা জানি যে, নখ নিয়মিতভাবে কাটা হয় না। ফলে এতে জমে থাকা ময়লা খুব সহজেই শিশুর পেটে চলে যায়, আর বিভিন্ন রোগও এই সুযোগটার জন্যই যেন অপেক্ষা করে থাকে। পেটের বিভিন্ন পীড়ার একটা অন্যতম কারণ হচ্ছে নখ কামড়ানো।

বেশি করে স্যুপ খাওয়ান
বর্ষা মৌসুমে অনেক সময় বৃষ্টিপাতের ফলে আবহাওয়া ঠাণ্ডা হয়ে যায়, সেইসাথে থাকে ঠাণ্ডা বাতাস। তাপমাত্রার এমন পরিবর্তনের সাথে অনেকের শরীরই কুলিয়ে উঠতে পারে না। আর শিশুদের অবস্থা তো আরও নাজুক। ঠাণ্ডা, সর্দি-কাশি লেগেই থাকে অনেকের। এখন আপনি সচেতনই হোন বা কম সচেতনই হোন, আপনার কোন হাত নেই আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের। কিন্তু পারবেন চিকেন স্যুপ রান্না করে শিশুর সামনে ধরতে। ঠাণ্ডার ক্ষেত্রে স্যুপের বিকল্প কেবল স্যুপই।

উপরের সামান্য কটি টিপস একটু মেনে চললে শিশুর অনেক অনাকাঙ্খিত রোগবালাই থেকে মুক্ত থাকবেন। নিজেও অনেক প্রশান্তি অনুভব করবেন।

0 comments

Leave a Reply