ডেঙ্গু

ডেঙ্গু একটি ভাইরাল ইনফেকশন। এটা একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষ থেকে আরেকজনে ছড়ায় না কিন্তু এডিস মশা থেকে ছড়ায়। এডিস মশা সাধারণত দিনে কামড়ায় বিশেষ করে ভোর বেলা এবং বিকেলবেলায়।এখনো পর্যন্ত এই অসুখের কোনো টিকা আবিষ্কৃত হয়নি এবং এর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নাই।তাই ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কে সম্যক ধারণাই কেবল এর থেকে মুক্তি দিতে পারে।

বাংলাদেশে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। 2000 সালের শুরুর দিকে আমাদের দেশে প্রথম এই ইনফেকশন ধরা পড়ে। তবে এই বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতে অনেক বৃষ্টিপাত হলেও পরবর্তীতে সেইরকম বৃষ্টি হয়নি, বরং থেমে থেমে কিছু বৃষ্টি হয়। যার ফলে অনেক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়াতে মশার বংশ বৃদ্ধি বেড়ে যায়।তাই এই বছর ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ অনেক বেশি দেখা যায়।

ডেঙ্গু রোগের কারণ

বর্তমানে চার প্রজাতির ডেঙ্গু ভাইরাস আছে ,যখন একটি এডিস মশা কোনো ডেঙ্গু ভাইরাস আক্রান্ত মানুষ কে কামড়ায় তখন সেই জীবাণু মশার মধ্যে প্রবেশ করে। এই মশাটি যখন অন্য মানুষ কে কামড়ায়, তখন ভাইরাস সেইমানুষের রক্ত প্রবাহে মিশে যায়।

একবার ডেঙ্গু হলে আর হবে না এই রকম কোনো কথা নাই। কারণ চার ধরণের ডেঙ্গু ভাইরাসের মধ্যে আপনি হয়তো একটি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন ,তাই বাকি তিন ধরণের ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

এডিস মশা সাধারণত আমাদের ঘর এবং ঘরের আশে পাশে বিভিন্ন স্থানে যেখানে পানি জমতে পারে সেইখানেই বংশ বিস্তার ঘটায়, যেমন ফুলের টব, ভাঙা পানির বোতল,পুরানো টায়ার,ড্রেইনে জমে থাকা পানিতে।

ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ

সাধারণভাবে, ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্তরা হয় উপসর্গবিহীন (৮0%) অথবা সাধারণ জ্বরের মত সামান্য উপসর্গ। ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হলে চার থেকে দশ দিনের মধ্যে সাধারণত উপসর্গ দেখা যায়, যেমন-

  • জ্বর, তাপমাত্রা 105 /106 ফারেনহাইট হতে পারে
  • মাথা ব্যথা
  • চোখের পিছনে ব্যথা
  • মাংস পেশী এবং জয়েন্টে ব্যথা
  • বমিভাব এবং বমি

    এই পর্যায়ে ৫০-৮০% উপসর্গে র‍্যাশ বেরোয়। এটা উপসর্গের প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে লাল ফুস্কুড়ি হিসাবে দেখা দেয়, অথবা পরে অসুখের মধ্যে(দিন ৪-৭) হামের মত র‍্যাশ দেখা দেয়। কিছু ছোট লাল বিন্দু এই জায়গায় আবির্ভূত হতে পারে যেগুলি ত্বকে চাপ দিলে অদৃশ্য হয় না, যেগুলি দেখা যায় ত্বকে চাপ দিলে এবং এর কারণ হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্থ রক্তবাহী নালী।

    বেশির ভাগ ক্ষেত্রে 7 থেকে 10 দিনের মধ্যে সকল উপসর্গ কমে যায়।কিন্তু হেমোরেজিক ডেঙ্গু সাধারণ ডেঙ্গুর তুলনায় বেশি মারাত্মক এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসার অভাবে তা রোগীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।এ ক্ষেত্রে জ্বরের সাথে সাথে রোগীর শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ষক্ষরণ হয়।রোগীর জ্বরের সাথে দাঁত ও মাড়ির গোড়া থেকে রক্ত পড়া,নাক দিয়ে বমির সাথে রক্ত পড়া,গায়ে রক্ত জমে ছিটা ছিটা দাগ, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়।এছাড়া পায়ুপথ দিয়ে রক্তপাত শুরু হতে পারে।আরো মারাত্মক আকার ধারণ করলে এ রোগ থেকে সার্কুলেটরি ফেইলিওর হয়ে আরো নানা জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে।

চিকিৎসা

ডেঙ্গু রোগের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নাই।বেশির ভাগ ডেঙ্গু জ্বরই সাত দিনের মধ্যে সেরে যায় এবং অধিকাংশই ভয়াবহ নয়। এর জন্য প্রয়োজন –

  • যথেষ্ট পরিমাণে পানি পান,বিশ্রাম ও যথেষ্ট পরিমাণ তরল খাবার।
  • জ্বর কমানোর জন্য এসিটামিনোফেন (প্যারাসিটামল) গ্রুপের ওষুধ সেবন করতে হবে ।
  • তবে ব্যথানাশক ওষুধ হিসেবে অ্যাসপিরিন বা ক্লোফেনাক-জাতীয় ওষুধ দেওয়া যাবে না।এতে রক্তক্ষরণ বেড়ে যেতে পারে।

    হেমোরেজিক বা রক্তক্ষয়ী ডেঙ্গু,যা খুবই কম হয়ে থাকে এবং এটা বেশি ভয়াবহ। এতে মৃত্যুও হতে পারে।জ্বরের সঙ্গে রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখামাত্র হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে বিশেষ চিকিৎসার জন্য।।জ্বর কমানোর জন্য বারবার গা মোছাতে হবে ভেজা কাপড় দিয়ে। আইভি ফ্লুইড দিতে হবে এবং ব্লাড প্রেসার মনিটর করতে হবে।প্রয়োজনে বেশি রক্তপাত হলে প্লেটলেট বা ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা দিতে হবে।

প্রতিরোধ

যেহেতু ডেঙ্গু রোগের কোনো নির্দিষ্ট টিকা বা ওষুধ নাই , সেক্ষেত্রে প্রতিরোধের মাধ্যমেই ডেঙ্গু রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।এর জন্য-

  • যেসব স্থানে এডিস মশা বাস করে সেই সব স্থানের এডিস মশার আবাস ধ্বংস করে দিতে হবে। তাই দিনের বেলা ঘরে যাতে মশা ঢুকতে না পারে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। জমে থাকা পানিতে এরা বংশ বিস্তার করে। ফুলের টব, কৃত্রিম পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, গাছের কোঠর, বাঁশের গোড়ার কোঠর, ডাবের খোসা, বাসার ছাদ প্রভৃতি স্থানে জমে থাকা পানিতে এদের বংশ বিস্তার ঘটে বলে সেখানটায় মশা নিধক ওষুধ ছিটিয়ে দিতে হবে। আর এভাবেই সম্ভব ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা। বাড়ির আশপাশের নদর্মা ও আবদ্ধ জলাশয়ে ওষুধ ছিটিয়ে মশা মারতে হবে। ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে হবে।
  • ডেঙ্গু মশা, মানে এডিস মশা সকাল-সন্ধ্যা কামড়ায়। অর্থাৎ ভোরে সূর্যোদয়ের আধাঘণ্টার মধ্যে এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের আধাঘণ্টা আগে এডিস মশা কামড়াতে পছন্দ করে। সুতরাং এই দুই সময়ে মশার কামড় থেকে সাবধান থাকতে হবে।
  • বাসার কারো ডেঙ্গু জ্বর হলে তাকে অবশ্যই মশারির মধ্যে রাখতে হবে যাতে অন্য কোনো সদস্য আক্রান্ত না হয়।
  • এই মৌসুমে যথা সম্ভব ফুল স্লিভ কাপড় , ট্রাউজার এবং mosquito repellent ব্যবহার করতে হবে।

 

Image source-wikipedia

0 comments

Leave a Reply