ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিস হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে রক্তে শর্করা (গ্লুকোজ) এর পরিমাণ খুব বেশি থাকে কারণ শরীর শর্করা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারে না৷ গ্লুকোজ সাধারনতঃ হজমকৃত শর্করা জাতীয় খাবার যেমন রুটি এবং চাল হতে তৈরী হয়৷ ইনসুলিন, একটি হরমোন যা অগ্ন্যাশয় হতে সৃষ্টি হয়, যা শরীরকে গ্লুকোজ থেকে প্রাপ্ত শক্তি কাজে লাগাতে সাহায্য করে।  

তিন ধরনের ডায়াবেটিস  গর্ভবস্হায় আপনাকে প্রভাবিত করতে পারে:

টাইপ ১ ডায়াবেটিসের বিকাশ ঘটে যখন আপনার শরীরের কোনো ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না৷ এটি সাধারণত শৈশব থেকে শুরু হয়।টাইপ ১ ডায়াবেটিস আক্রান্ত অধিকাংশ নারী গর্ভবতী হওয়ার আগেই সাধারনত তাদের অবস্থা সম্পর্কে জেনে যান এবং এই ব্যাপারে সচেতন হতে পারেন। টাইপ 1 ডায়াবেটিস আক্রান্তদের রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের জন্য ইনসুলিন নিতে হয়৷

 

টাইপ ২ ডায়াবেটিস এর বিকাশ ঘটে যখন আপনার শরীর যথেষ্ট ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না, বা যে ইনসুলিন উৎপাদিত হয় তা সঠিকভাবে কাজ করে না৷ এটা প্রায়ই অতিরিক্ত ওজনের মানুষের মধ্যে ঘটে এবং সাধারণত 40 বা তার বেশী বয়সী মহিলাদের বেশি হয়ে থাকে৷ কিন্তু এটা বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকান কিংবা আফ্রিকান-আমেরিকানদের হতে পারে। 

আপনাকে আগে থেকে সচেতন হতে হবে যাতে আপনার  টাইপ ২ ডায়াবেটিস আছে কিনা তা গর্ভবতী হওয়ার আগেই নির্ণয় করা হয়।  টাইপ 2 ডায়াবেটিস চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রন করা যায়, কিছু ক্ষেত্রে রক্তে গ্লুকোজ কমানো যায় ট্যাবলেট সেবনের অথবা ইনসুলিন ইনজেকশন সেবনের মাধ্যমে৷

এ ধরনের ডায়াবেটিস শুধুমাত্র গর্ভাবস্থায় ঘটে।এটা গর্ভাবস্থার যেকোনো পর্যায়ে ঘটতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বেশি প্রচলিত। এটা ৫% নারীদের প্রভাবিত করে৷ এটা ঘটে যখন আপনার শরীর অতিরিক্ত ইনসুলিন গর্ভাবস্থার চাহিদাগুলি পূরণ করতে পারে না৷গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস বাচচা প্রসবের পর আর থাকেনা৷গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস যদি আপনার গর্ভবতী হওয়ার সময় থাকে তাহা হইলে পরবর্তী জীবনে দ্বিতীয়বার টাইপ ২ ডাইবেটিস হওয়া্র  সম্ভাভবনা থাকে৷গর্ভবতী হওয়ার সময় যদি আপনার ডায়াবেটিস হয় তখন আপনি এবং আপনার শিশুর জটিলতা ঝুঁকিতে থাকে৷ আপনি এই ঝুঁকি কমাতে পারেন, কিন্তু এটা নির্ভর করে আপনার ডায়াবেটিস এর ধরনের উপর৷

আপনার ইতিমধ্যে যদি টাইপ 1 বা টাইপ 2 ডায়াবেটিস হয়ে থাকে, তাহলে আপনি  নিচে  উল্লেখকৃত ঝুঁকিগুলোর  মধ্যে আছেন যেমন:

  •  শিশুর আকার বড় হয়ে যাওয়া, যা গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এবং পরবর্তীতে সিজারিয়ান করার অবস্থা হয়৷
  • গর্ভস্রাব হয়৷
  • টাইপ 1 ডায়াবেটিস মানুষদের নতুন সমস্যা হতে পারে, অথবা পুরানো সমস্যা আরো বাড়তে পারে, যেমন, তাদের চোখ সমস্যা(ডায়াবেটিক রেটিনা ক্ষয় বলা হয়) এবং তাদের কিডনি সমস্যা (ডায়াবেটিক nephropathy) হতে পারে৷
  • আপনার শিশুর ঝুঁকি হতে পারে: – স্বাভাবিকভাবে বা্ড়তে পারেনা এবং জন্মগত অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়, বিশেষ করে হার্টে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়৷
    – মৃত বাচ্চা হচ্ছে অথবা জন্মের পর মৃতু্ হচ্ছে।
    – জন্মের পর পরই স্বাস্থ্য সমস্যা হচ্ছে  (যেমন হার্ট এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা) এবং এক্ষেত্রে হাসপাতালে রেখে যত্ন প্রয়োজন৷৷
    – পরবর্তী জীবনে স্থূলতা বা ডায়াবেটিস দেখা দেয়। 

 

আপনার আগে থেকেই ডায়াবেটিস থাকলে কিভাবে ঝুঁকি কমাবেনঃ 

আপনার নিজের জন্য ঝুঁকি এবং আপনার শিশুর স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে শ্রেষ্ঠ উপায় হলো আপনার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রিত করা।গর্ভবতী হওয়ার পর আপনার ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন৷ আপনি গর্ভবতী হওয়ার পূর্বে ডায়াবেটিক বিষয়ে আলাপ করে নিন।

আপনি রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিরনয়ের একটি পরীক্ষা,HbA1c পরীক্ষা নামক একটি রক্ত পরীক্ষা করতে পারেন।আপনি গর্ভবতী হওয়ার পূর্বে যদি গ্লুকোজের পরিমাণ 6.1%  থাকে তবে সেটা ভালো। তবে আপনার গ্লুকোজের মাত্রা যদি এর চাইতে বেশি হয়, তাহলে গর্ভধারনের আগে  আপনাকে রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে যাতে আপনার শিশুর জন্য জটিলতার ঝুঁকি এড়াতে পারেন৷ আপনার ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ আপনার সাথে আলোচনা করে এই সমস্যার ভাল সমাধান করতে পারেন৷

ফলিক এসিড

ডায়াবেটিস মহিলাদের উচ্চ ডোজের ফলিক অ্যাসিড নিতে হয়৷ গর্ভবতী হতে চেষ্টা করা মহিলাদের জন্য স্বাভাবিক দৈনিক ডোজ এবং গর্ভবতী নারীদের জন্য স্বাভাবিক দৈনিক ডোজ 400 মাইক্রোগ্রাম৷ ডায়াবেটিক নারীদের দিনে 5mg নেওয়া উচিত৷ আপনার ডাক্তার আপনার জন্য এই উচ্চ ডোজ ফলিক অ্যাসিড প্রেস্ক্রাইব করবেন৷ ফলিক অ্যাসিড শিশুর জন্মগত ত্রুটি যেমন spina bifida, থেকে আপনার শিশুকে রক্ষা করতে সাহায্য করে৷ গর্ভাবস্থার ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করতে হবে।

ডায়াবেটিস চিকিৎসা

আপনার ডায়াবেটিস চিকিৎসা  গর্ভাবস্থায় একই থাকতে পারে, বা নতুন কিছুর সাথে সমন্বয় করা হতে পারে, এটি আপনার চাহিদার উপর নির্ভর করে। আপনি যদি উচ্চ রক্তচাপ থাকে তবে আপনার ডায়াবেটিস এর চিকিৎসায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হতে পারে। 

এই অবস্থায় ডাক্তারের কোন অ্যাপয়েনমেন্ট বাদ দিবেন না। আপনার নিজের এবং শিশুর স্বাস্থ্যরক্ষায় এটি অত্যন্ত জরুরি।

গর্ভাবস্থায় আপনার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা  আরো ঘন ঘন নিরীক্ষণ করতে হবে৷ গর্ভাবস্থায় আপনার চোখ ও কিডনি  সচারচর পরীক্ষা করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যাতে শিশুর স্বাস্থ্যের অবনতি না হয়। কারন চোখ ও কিডনি সমস্যার কারনে পরিস্হিতি খারাপ হয়ে যেতে পারে৷ পরবর্তিতে আপনি দেখতে পারেন যে আপনার ডায়াবেটিস উপর বেশি নিয়ন্ত্রন রাখলে আপনি বা আপনার শিশু hypoglycaemic (কম রক্ত শর্করা) আক্রমণের স্বীকার হতে পারেন।এই জিনিষ আপনার শিশুর জন্য ক্ষতিকর নয়, কিন্তু আপনি এবং আপনার সঙ্গী এই পরিস্হিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন জানা একান্ত প্রয়োজন৷

গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস

আপনার গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে যদি :

  • আপনার প্রয়োজনাতিরিক্ত ত্তজন বিএমআই (বডি মাস ইনডেক্স) মোতাবেক যদি 30 এর উপরে থাকে, (বিএমআই স্বাস্থ্যকর ওজন ক্যালকুলেটর ব্যবহার করবেন , কিন্তু মনে রাখবেন যে এই ক্যালকুলেটর গর্ভাবস্থায় ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত নয়)
  • আপনি পূ্র্বে বেশী ওজনের একটি বড় শিশুর জন্ম  দিয়েছেন, যাহার ওজন 4.5kg (9.9lb) এর বেশী ছিলো৷
  • আপনার অতীতে গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস ছিল
  • আপনার পিতা বা মাতা, ভাই, বোন অথবা পিতামহীদের পূ্র্বে ডায়াবেটিস ছিলো৷  
  • আপনার উৎপত্তি যদি দক্ষিণ এশীয়, কালো ক্যারিবিয়ান বা মধ্যপ্রাচ্যের হয়ে থাকে, কারন এই জাতিগোষ্ঠীর গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকে৷

এইসব উচ্চ-ঝুঁকি সমস্যা যদি আপনার থেকে থাকে আপনার গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস আছে কিনা পরীক্ষা করতে হবে৷ আপনি আপনার রক্তে গ্লুকোজ মাত্রা পরীক্ষা করার জন্য  বাড়িতে একটি টেস্টিং কিট নেওয়া যাইতে পারে, যাতে আপনি ২৮ সপ্তাহে অথবা আগে একটি মৌখিক গ্লুকোজ সহনশীলতা পরীক্ষা (OGTT বা GTT) করা যাইতে পারে যদি আপনার অতীতে গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস ছিল৷

GTT পরীক্ষা একটি রক্ত পরীক্ষা যা খাওয়ার পূ্র্বে করতে হয়৷আপনাকে বলা হবে কতক্ষন না খেয়ে থাকতে হবে(এটা প্রায়ই রাতারাতি সম্ভব)৷ তারপরে আপনাকে নির্দিষ্ট সময়ের পরে বলা হবে গ্লুকোজ পানীয় পান করতে এবং দুই ঘন্টা পরে আরেকটি রক্ত পরীক্ষা নিতে বলা হবে। 

যদি আপনার গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস ধরা পরে তবে আপনি ঝুঁকিতে আছেন:

  • একটি বড় শিশুর জন্য স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রসব কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ন থাকে তাই সিজারিয়ানের মাধ্যমে প্রসব করাতে হয়৷
  • আপনার মৃত শিশু হওয়ার মত ঝুঁকি হতে পারে৷
  • খুব শীঘ্রই জন্মের পর স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয় (যেমন হার্ট এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হিসাবে) এবং  হাসপাতালে যত্ন প্রয়োজন
  • পরবর্তী জীবনে স্থূলতা বা ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে৷

 

গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস  নিয়ন্ত্রণ

 

নির্ধারিত সময়ের ডায়াবেটিস প্রায়ই খাদ্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায়৷ আপনার রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখার জন্যে একজন পুষ্টিবিদ আপনাকে উপদেশ দিবে কিভাবে দৈননদিন খাবার খাইতে হইবে৷ এছাড়াও আপনি আপনার রক্তে গ্লুকোজ মাত্রা পরীক্ষা করার জন্য একটি কিট দেওয়া হবে৷ আপনার রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল না থাকে হয়, বা আপনার শিশুর অবস্হা যদি ultrasound স্ক্যান-এ বড় দেখা যায়, তাহলে আপনাকে ট্যাবলেট নিতে বা নিজেকে ইনসুলিন ইনজেকশনও দিতে হতে পারে৷

 

আপনার যে ধরনের ডায়াবেটিস হোক না কেন আপনি ঘন ঘন বা সময় বেশী লাগলেও ডাক্তারের সাথে সাক্ষাত করুন।  আপনার এবং আপনার শিশুর অগ্রগতি পরীক্ষা করা, আপনার খাবারের পরামর্শ  এবং রক্তে গ্লুকোজ মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া হবে৷

প্রসববেদনা ও জন্ম

আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে আপনার উচিত একটি হাসপাতালে একজন কনসালট্যান্ট নেতৃত্বাধীন প্রসূতি দলের সাহায্য দিয়ে প্রসব করানো। 

ডায়াবেটিক মায়েদের শিশুরা প্রায়ই স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে থাকে৷ এটার কারণ হলো রক্তে গ্লুকোজ আপনার কাছ থেকে সরাসরি শিশুর মধ্যে আসে তাই আপনার  রক্তে উচ্চ মাত্রা গ্লুকোজ  থাকলে আপনার শিশু ক্ষতিপূরণের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ইনসুলিন উৎপাদন করে৷ সেকারনে আপনার শিশু অধিক চর্বি এবং টিস্যু সংরক্ষণ করে। এরফলে  মায়ের গর্ভাপাত হতে পারে, ফলে একটি হাসপাতালে দক্ষ টিমের প্রয়োজন হইতে পারে৷

 

জন্মের পরে

আপনার শিশুর জন্ম হওয়ার দুই থেকে চার ঘণ্টা পর, তাদের রক্তে গ্লুকোজ  আছে কিনা পরীক্ষা করার জন্য গোড়ালি ফুটা করে রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে৷ জন্মের (30 মিনিটের মধ্যে) পর পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার শিশুকে খাওয়াতে হবে যাতে আপনার শিশুর রক্তে গ্লুকোজ একটি নিরাপদ পর্যায়ে রাখতে সাহায্য করে৷

আপনার শিশুর রক্তে গ্লুকোজ একটি নিরাপদ পর্যায়ে রাখা না গেলে তার জন্য বাড়তি যত্ন প্রয়োজন হবে৷ এই শিশুদের জন্য বিশেষ যত্ন সম্পর্কে আরো জানা প্র্রয়োজন৷ এই সমস্ত শিশুদের রক্তে গ্লুকোজ বৃদ্ধির জন্য একটি ড্রিপ দেওয়া যেতে পারে। 

গর্ভাবস্থার পর আপনার রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রচুর মাত্রায় ইনসুলিন প্রয়োজন হবে না৷ আপনি আপনার ইনসুলিন হ্রাস করতে পারেন আপনার গর্ভাবস্থা/গর্ভাবস্থার পূ্র্বের ডোজ পর্যন্ত।যদি আপনার টাইপ 2 ডায়াবেটিস থেকে থাকে তাহলে আপনাকে গরভাবস্থার আগের ওষুধে ফিরে যেতে হবে।

আপনার যদি শুধু গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস থাকে তাহলে আপনারর শিশু জন্মের পর সব চিকিৎসা বন্ধ করতে পারবেন৷ আপনি বাড়িতে যাওয়ার আগে আপনার রক্তে গ্লুকোজ মাত্রা নির্ণয়ের জন্য একটি পরীক্ষা এবং প্রসবের ছয় সপ্তাহ পর জন্মোত্তর চেক দেওয়া হবে৷ এছাড়াও আপনাকে খাদ্যের এবং ব্যায়াম উপর পরামর্শ দেওয়া হবে৷

 

0 comments

Leave a Reply