কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য

“মায়া আপা, আমি একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করি । সকাল ৯-৫ টা পর্যন্ত অফিস করার কথা । সেখানে অনেক সময় অফিস থেকে বের হতে ৯-১০টা বেজে যায় । পরিবারকে কোন সময় দিতে পারিনা । এর সাথে রয়েছে অফিসের রাজনীতি আর বসের মন জুগিয়ে চলার চাপ । সবকিছু অসহ্য মনে হয় । ধীরে ধীরে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি বলে মনে হচ্ছে । আমি কি করবো ?”

 

আমাদের অনেকের জীবনেই এমন ঘটনা ঘটে চলেছে, যা মানসিক সুস্থতা ভীষণভাবে বিঘ্নিত করছে । আমাদের কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতা অপরিহার্য । মানসিক সুস্থতা বলতে বোঝানো হয় যখন একজন ব্যক্তি তার সমস্ত কর্মক্ষমতা বুঝতে পারে ও সে অনুযায়ী কাজ করতে পারে, দৈনন্দিন চাপের সাথে মানিয়ে নিতে পারে এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে । এছাড়া সামাজিক কাজে অবদান রাখতে পারে ।  এথেকে বোঝা যায় যে কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতা আমাদের কাজকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে । মানসিকভাবে সুস্থ একজন কর্মী যত দ্রুত ও সঠিকভাবে একটি কাজ সম্পন্ন করতে পারবে একজন মানসিকভাবে অপ্রস্তত ব্যক্তির পক্ষে তা করা সম্ভব নয় ।

যেসব বিষয় কর্ম পরিবেশে চাপ সৃষ্টি করে থাকে তার মধ্যে রয়েছে – অতিরিক্ত কাজের চাপ, দীর্ঘ সময় কাজ করা , চাকরী চলে যাওয়ার ভয় , কাজের ওপর নিয়ন্ত্রন না থাকা ইত্যাদি ।

 

কাজের চাপ মোকাবেলার জন্য যেসব করনীয় রয়েছে তা হলো

  • পরিমিত মাত্রায় কাজ করা – প্রত্যেক মানুষের নির্দিষ্ট কর্মক্ষমতা রয়েছে, এর বেশী কাজ করলে একসময়ে কাজের চাপে অচল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে । একে বলা হয় বার্ন আউট ।
  • কাজকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নেওয়া – প্রত্যেকটি বড় কাজের থাকে ছোট ছোট করনীয় ধাপ । কাজগুলোকে এভাবে ধাপে ধাপে ভাগ করে নেয়ার ফলে চাপ কমে আসে এবং কাজ করা সহজ হয় ।
  • সহকর্মীদের সাহায্য নেয়া – অনেক কাজে সহকর্মীদের সাহায্য নিলে সেটি করা সহজ হয় । তবে অনেকেই এই সাহায্য নেয়ার ব্যাপারে ইতস্তত করে । যা কাজের সময় ও ব্যক্তির মানসিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে । তাই দ্বিধা না করে প্রয়োজনীয় কাজ ভাগাভাগি করে নিলে চাপ যেমন কমে যায় তেমন কাজটি করাও সহজ হয় ।
  • পরিবারের সদস্যদের সাহায্য নেয়া – সারাদিন অফিস করে মনে অনেক কথা জমে থাকে, জমে থাকে অনেক মানসিক চাপ । এই কথাগুলো পরিবারের সদস্যদের সাথে বললে মানসিক চাপ কমে যায় । এছাড়াও কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত মানসিক ও শারীরিক পরিচর্যা প্রয়োজন হয় যা পরিবার থেকে একজন ব্যক্তি পেতে পারে ।
  • বন্ধুদের সাহায্য নেয়া – কাজের অনেক ব্যাপারেই একজন ব্যক্তি দুর্বল হতে পারে, সেক্ষেত্রে সে বন্ধুদের সাহায্য নিতে পারে ।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করা – নিয়মিত ব্যায়াম করার ফলে দেহ ও মনে চনমনে ভাব আসে । এই অনুভূতি কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিকে আরো কর্মচঞ্চল হতে সহায়তা করে ।
  • স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস – পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস ব্যক্তিকে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায় এবং রোগ থেকে দূরে রাখে । যা ব্যক্তির জন্য উপকারী ।
  • নিকোটিন, অ্যালকোহল সহ যেকোন মাদক দ্রব্য পরিহার করা – যেকোন ধরনের মাদক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে থাকে । এটি মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় । তাই মাদক দ্রব্য পরিহার করা উচিৎ ।  
  • পর্যাপ্ত পরিমানে ঘুম – পর্যাপ্ত পরিমানে ঘুম ব্যক্তিকে কর্মক্ষম রাখতে সহায়তা করে । এর ফলে মস্তিষ্ক শান্ত থাকে এবং কাজে মনোযোগ দেয়া সহজ হয় ।
  • কিভাবে কাজ করা হচ্ছে তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে থাকে । কাজের রুটিন গুছিয়ে নিলে তা চাপ কমাতে সাহায্য করে ।
  • একটি নির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করা  – প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট তালিকা অনুসরণ করে কাজ করলে তা সুবিধাজনক হয় । এর ফলে কোন কাজের পর কোন কাজ করবে  তা বুঝতে সুবিধা হয় এবং কাজ বাদ পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকেনা ।
  • কাজের মাঝে বিরতি নেয়া – একটানা কাজ করলে কাজের মধ্যে একঘেয়েমি চলে আসে । একটানা কাজ না করে তাই মাঝে মাঝে কাজ থেকে বিরতি নেয়া প্রয়োজন হয় ।
  • নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকে কাজ করা – প্রত্যেক মানুষের কাজের জন্য নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে । তাই সবার উচিৎ সে সীমার মধ্যে থেকে কাজ করা  । অনিয়ন্ত্রনযোগ্য কোন কিছু করতে গেলে তার ফলে মানসিক সুস্থতা ব্যাহত হতে পারে ।
  • গুরুত্ব অনুযায়ী কাজ ভাগ করে নেয়া – সবকাজ সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে তাই গুরুত্ব অনুযায়ী কাজকে ভাগ করে নেয়া যেতে পারে । এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আগে করা এবং অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরে করা উচিৎ । এতে কাজের চাপ কম অনুভব হবে। 
  • সবসময় নিখুঁতভাবে কাজ করতে চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকা – কোনকাজেই শতভাগ নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয় । তাই কাজে শতভাগ নিখুঁত হতে চেষ্টা না করে সঠিকভাবে কাজটি সম্পন্ন করার প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিৎ ।
  • নিজের কাজ নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা না করা – কাজের ভালো মন্দ বিভিন্ন দিক থাকে তাই কাজের শুধু নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে না ভেবে । কাজের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়েও ভাবা উচিৎ। 
  • তারপরেও বিভিন্ন কারণে কাজের চাপ তৈরি হতে পারে তবে এটি মোকাবেলা করার কিছু পদ্ধতি রয়েছে যেমন –এব্যাপারে  দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলা । কাজগুলো ব্যক্তির সক্ষমতা অনুযায়ী দেয়া হচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখা । কর্মক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব ও যেকোন ঝামেলা সমাধান করা ইত্যাদির মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত রাখা যায় ।

 

ছবি সূত্র: Google.com

0 comments

Leave a Reply