“আমি আমার সঙ্গীর নির্যাতনের শিকার”

“চার বছর আগের কথা। সবে ঢাকায় এসে নতুন কাজে যোগ দিয়েছি। তখনই গোলামের (ছদ্মনাম) সাথে পরিচয়। ছেলেটি ছিল খুবই আকর্ষণীয় । সে আমাকে নিয়মিত কার্ড পাঠাতো। আমার দিকে সে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকত, বলতো তার নাকি আমার দিকে তাকিয়ে দেখতে ভাল লাগে। তবে পরে আমি বুঝতে পারি, যে আমার পোশাক পরিচ্ছদ বাছ-বিচার করাই ছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য। কিছুদিন না যেতেই সে জানতে চাইল, আমি সাজ-গোজ করি কেন? আমাকে নাকি এমনিতেই খুব ভাল দেখায়। এরপর থেকে আমি কী পোশাক পরব – না পরব, তা সে ঠিক করে দিতে লাগল। এভাবে আমার পোশাক-পরিচ্ছদের উপর সে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নিল।”


শুরুতে দুর্ব্যবহার, পরে নির্যাতন
“দু’মাস পর থেকেই কাজ থেকে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য সে আমার অফিসের বাইরে অপেক্ষা করত। বেরিয়ে আসতে দেরি হলেই সে রেগে যেত। বলতো আমি অন্য ছেলেদের সাথে হাসি-তামাশা করার জন্য নাকি দেরি করেছি। সে বোঝাতে চাইত যে আমাকে খুব ভালবাসে বলেই সে এভাবে অপেক্ষা করে। দিন দিন সে গম্ভীর হয়ে যেতে লাগল। আহরহই সে ঝগড়া শুরু করে দিত। এছাড়াও সে গালাগালি করত, আর আমার কথা বলার ভঙ্গী নকল করে আমাকে অপমান করত।”

“ভেতরে থেকে কিছু একটা যেন আমাকে বলত “তুমি ভাল নেই” — কিন্তু আমি তা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করতাম। দেখা যেত, কখন, কী করছি – গোলামের কাছে ফোনে তার ফিরিস্তি দিতে দিতেই আমার বেশীর ভাগ সময় কেটে যেত।”

“যেদিন কাজের প্রয়োজনে আমাকে রাত তিনটা পর্যন্তও জেগে থাকতে হত সেদিনও সে চাইত কাজ থেকে ফিরে সে যেন ঠিক ঠিক তার রাতের খাবার টেবিলে সাজানো দেখতে পায়। এভাবে একটু একটু করে সে আমার জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ, আর পরে একমাত্র বিষয়ে পরিণত হল। আস্তে আস্তে পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের সাথে আমার যোগাযোগ কমে গেল।”

“এক রাতে এরকম কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে গোলাম আমাকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিল। তখন আমি উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করলাম এবং তাকে মনে করিয়ে দিলাম সে আমার সাথে এমন করতে পারে না। এরকম আচরণের জন্য তাকে কারাগারেও যেতে হতে পারে। শুনে প্রথমে সে হাসল আর আমাকে ‘বাড়তি ঝামেলা’ বলে অপমান করল। এরপর সে পুলিশকে ফোন করল।”

“গোলাম পুলিশকে বলল যে আমাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছে, এবং গোলামকে হেনস্তা করার জন্য পরের দিন আমি নাকি তাদের ফোন করে গোলামের বিরুদ্ধে আমাকে মারধরের অভিযোগ করব বলে ভাবছি। আগে এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়িনি। তাই খুব ভয় পেয়ে গেলাম। একই সাথে বেশ অস্বস্তিতেও ভুগতে লাগলাম এবং হতভম্ব হয়ে গেলাম। কী করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।”


মারধর এবং অপদস্থ করা
“এরপর থেকে তার হাতে মারধরের শিকার হওয়া একটা নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়াল। একবার সে আমার একটি আঙ্গুল ভেঙ্গে দিল যার জন্য আমাকে হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। আরেকবার মাথা, মুখ এবং দেহে ক্ষত নিয়ে হাসপাতালের জরুরী বিভাগেও গিয়েছিলাম।”

“সে আমার দিকে থুতু ছিটাতো, ধাক্কা মেরে ফেলে দিত, লাথি মারত এবং কামড়াতো। একবার সে আমাকে গাড়ি চাপা দেবার চেষ্টাও করেছিল। প্রতিবার নির্যাতনের পর সে বেশ যত্ন করে আমার ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে দিত আর বলত সে আমাকে সব কিছু থেকে বাঁচিয়ে রাখবে। আমার মনে হচ্ছিল আমি পাগল হয়ে যাব।”

“মারধরের চাইতেও সে যেভাবে আমাকে অপমান করত সেটার সাথে মানিয়ে নেয়াটাই ছিল আমার পক্ষে সবচাইতে কঠিন। একদিকে খুব অনিশ্চয়তাবোধে ভুগতে থাকলাম, অন্যদিকে আমার দৃষ্টিতে কোনটি ঠিক আর কোনটি ভুল, সেই বোধও হারিয়ে ফেলছিলাম। আইনের বিধি-নিষেধ ভুলে তার এমন সব আচরণ আমি মেনে নিতে থাকলাম যা আগে হলে কিছুতেই হতে দিতাম না।”

“আমি কিছু চাইলে গোলাম আমাকে হাঁটু গেড়ে মিনতি করতে বাধ্য করত অথবা মেঝেতে টাকা ছুড়ে দিয়ে তা কুড়িয়ে নিতে বলত।”


বিচ্ছেদ ও পরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া
“আমি নিজেকে কুৎসিত ভাবতে লাগলাম। যখন একসাথে বাইরে যেতাম গোলাম ড্যাবড্যাব করে অন্য মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকত, আর আমি অভিযোগ করলেই বলত এটা নাকি আমার কল্পনা। একটু একটু করে আমার যুক্তিবোধ ও আত্মসম্মানবোধ হারিয়ে যেতে লাগল, আর নিজেকে নিতান্ত তুচ্ছ বলে মনে হতে লাগল। এভাবে সে দিনে দিনে আরো কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠতে লাগল। এমনকি সে আমার মাকে বলে ছিল যে আমার সাথে যোগাযোগ করতে গেলে যেন উনি গোলামের মোবাইল ফোনে ফোন করে, কেননা ওভাবেই আমাকে পাওয়া ‘সহজ হবে’।”

“প্রতিরাতে সে আমার ব্যাগ হাতরাত আর আমার গাড়ি কত মাইল চলেছে সেটা লক্ষ্য করে দেখত। আমি যখন ঘরে পায়চারি করতাম, অথবা ঝগড়ার পর কাঁদতাম, সে তখন আমার ছবি তুলে রাখত।”

“কিন্তু যেদিন গোলাম আমাকে corkscrew দিয়ে আঘাত করল, সেদিন আমি তাকে ত্যাগ করে চলে আসলাম। এরপর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে আমার অনেকটা সময় লেগেছিল, কেননা ছেড়ে আসার পরও সে আমাকে নানাভাবে হয়রানি করত। তার সাথে দেখা হবার আগে শিক্ষকতা পেশায় উত্তরোত্তর যে সফলতা আমি পাচ্ছিলাম তার অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল।”

“এরপর বন্ধু ও পরিবার পরিজনের সহযোগিতায় আমি আবার আগের জীবন ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম। স্বাভবিক জীবনে ফিরে আসতে আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা এখন আমি আবার নিজেকে বুঝতে পারছি।”

যৌন হয়রানির শিকার যে কেউ পূর্ণ গোপনীয়তার সাথে সাহায্য এবং চিকিৎসা নিতে পারেন। নিজের পরিচয় না দিয়ে মায়া আপাকে প্রশ্ন করুন অথবা পেশাগত সাহায্য পেতে কারো সাথে দেখা করুন। অথবা আপনার কি করণীয় সেই সম্পর্কে জানতে আমাদের আইনজীবীদের সাথেও আলাপ করতে পারেন।

0 comments

Leave a Reply